মনিরুজ্জামান
প্রকাশ: 19শে আষাঢ় ১৪৩২ | ৩ই জুলাই ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ফ্রানৎস কাফকার মেটামরফোসিস গ্রন্থটি পড়েছিলাম আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে। হঠাৎ করে গ্রন্থটির কথা স্মরণ হওয়াতেই হাতে উঠে গেল কলম। বইটি যখন প্রথম পড়েছিলাম তখন তার মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারি নাই। আজও যে অনুধাবন করতে পেরেছি তা হলফ করে বলতে পারি না। মগজ থেকে কলমে যা এসেছে তাই লিখেছি।
মাত্র ৬১ পৃষ্ঠার ক্ষুদ্র একটি উপন্যাস আবার কেউ কেউ বলে থাকেন গল্প। উপন্যাসের নায়ক গ্রেগর সামসা। তার ছোট পরিবারকে কেন্দ্র করেই শৈল্পিক আকারে চিত্র এঁকেছেন ফ্রান্জ্ কাফকা। আমাদের দেশে কাফকার নাম শুনেননি এমন দুর্লব পাঠক খুঁজে পাওয়া দুরূহ ব্যাপার।
ফ্রানৎস কাফকা গ্রেগর সামসা ও তার বাবা-মা এবং ছোট বোনকে ঘিরে বিষাদময় কাহিনীর যে বর্ণনা দিয়েছেন তা কেবল গল্পের ছলে বলে যাওয়া গল্প নয়। কাফকা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে কলম আর খাতায় শৈল্পিকভাবে রূপ দিয়েছেন।
উপন্যাসটি পাঠের মধ্য দিয়ে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করা যায় যে, এটি কেবল গ্রেগর সামসা বা কাফকার জীবনের কথাই নয়। এটি মধ্যবিত্ত সকল সাধারণ মানুষের কথা। যে কোন পাঠক পুস্তিকাটি পাঠের মধ্য দিয়ে বুঝতে পারবেন যেন তার জীবনের অব্যক্ত কথাটি কাফকার কলমে ফুটে উঠেছে। প্রথম বাক্যটি পাঠের মধ্য দিয়েই বুঝা যায় কাফকার শৈল্পিক হাত কতটা পক্ব।
তিনি লিখছেন, “নানা আজেবাজে স্বপ্ন দেখার পর একদিন সকালে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে গ্রেগর সামসা দেখল যে এক বিশাল পতঙ্গে রূপান্তরিত হয়ে সে তার বিছানায় পড়ে আছে।”
সামসা আরশোলাতে রূপান্তরিত হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। কেন এবং কীভাবে সে পতঙ্গে পরিণত হল ‘মেটামরফোসিস’ গ্রন্থটি পড়লেই তা জানা যাবে। গ্রেগর সামসা ভ্রাম্যমাণ বাণিজ্যিক একজন কর্মচারী। প্রতিদিন ভোর চার’টায় ঘড়িতে চেঁচানো অ্যালার্ম দিয়ে রাখেন। অ্যালার্ম চেচিয়ে উঠলেই তার মনে পড়ে যায় এই বুঝি চারটা বেজে গেল। অতি শীঘ্রই নিত্য প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে ট্রেন ধরতে হবে। গ্রেগর যখন তার বাণিজ্যিক অর্ডার সংগ্রহ করে কোন হোটেলে বসে তা লিখতে শুরু করেন সে সময় অন্যরা কেবল প্রাতহ্রাস করতে হোটেলে আসেন।
আরশোলায় রূপান্তরিত হয়ে গ্রেগর বিছানায় পড়ে ভাবছেন, অফিসে যেতে দেরি হচ্ছে বিধায় কেরানি মহোদয় এই বুঝি আসলেন। গ্রেগরের ভাবনার অংশটি লেখকের জবানিতে শুনলেই শ্রুতি মধুর হয়, “পাঁচ বছরের চাকরিকালে সে একদিনের জন্যও অসুস্থ হয়নি। বড়কর্তা নিঃসন্দেহে নিজেই রোগ-বীমার ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে চলে আসবেন, তার বাবা- মাকে পুত্রের আলসেমির জন্য তিরস্কার করবেন, বীমা-ডাক্তারের মতামতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তার সব অজুহাত নাকচ করে দেবেন, আর বীমা-ডাক্তার তো সমস্ত মানবজাতিকেই মনে করেন রীতিমতো সুস্থ, ফাঁকিবাজ একটা গোষ্ঠী।”
বলে রাখা ভালো কাফকা নিজেও একটা বীমা কোম্পানিতে চাকরি করতেন।
পরিবারের সকল দায়িত্ব গ্রেগর সামসার কাঁধে। জীবন যুদ্ধে ঠিকে থাকার জন্য তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। অর্থ কষ্টে, আনন্দহীন, দুশ্চিন্তায়, দুর্ভাবনায় জীবন কাটিয়ে যাচ্ছেন। এই কঠিন জীবন সংগ্রামের মধ্যেই স্বপ্ন দেখছেন ছোট বোন গ্রেটাকে সংগীত শেখানোর জন্য কনর্ভেটোরিয়ামে ভর্তি করবেন। গ্রেটা ভালো বেহালা বাজাতে পারেন।
সামসার এই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল বাস্তবে তা পরিণত হয়নি। জগতের মধ্যবিত্ত শ্রেণির সকল মানুষের কথা কাফকা অল্প কথার মধ্যেই বলেছেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই দুরবস্থা থেকে কীভাবে মুক্তি পাবে? সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন ব্যতীত মধ্যবিত্ত শ্রেণির কোনো পরিবর্তন হবে না। মানুষের জন্য রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের জন্য মানুষ নয়।
জাগতিক বাস্তবতায় মানুষ দৈহিকভাবে আরশোলা হতে পারে না। কিন্তু চিন্তার জগতে সকলেই গ্রেগরের মতো হয়ে আছি। জীবিকা নির্বাহের জন্য কেবল অর্থের পেছনে ছুটছি তো ছুটছিই এর বাইরে জীবনে অন্য কোন চিন্তা করার সুযোগ নেই। আমাদের জীবনকে এমন ভাবে আষ্টে-পৃষ্ঠে বেঁধে রাখা হয়েছে যেন আমরা কেবলই জীবন যুদ্ধে ঠিকে থাকার জন্য অর্থের পেছনেই ছুটি।
যে দুধ গ্রেগরের প্রিয় ছিল আরশোলায় রূপান্তরিত হওয়ার পর তা আর ভালো লাগছে না। পঁচা-বাসি খাবারই তার প্রিয় হয়ে উঠল। তদ্বরূপ আমাদের চিন্তাও তেমনি পঁচা-বাসির জগতের মধ্যে বন্দি হয়ে আছে। মুক্ত চিন্তার আনন্দ লাভের অধিকার আমাদের নেই। মুক্ত চিন্তার অধিকার না থাকলে স্বাধীন জীবন উপভোগ করা যায় না।
মানুষ যখন তার অর্থোপার্জনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখন সে পরিবারের নিকট সমাজের নিকট রাষ্ট্রের নিকট বোঝাস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। এই বিষয়টি নিখুঁতভাবে চিত্রায়িত করেছেন কাফকা তার রচনায়। যার উপার্জনে সংসার চলতো তার উপার্জন ক্ষমতা হারানোর ফলে পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়।
গ্রেগর আরশোলাতে রূপান্তরিত হয়েছে বটে তার কথা বলার ক্ষমতা নেই কিন্তু মানুষের কথা বুঝার ক্ষমতা আছে। এতে করে কি বা করতে পারে সে? কেবল প্রিয় মানুষদের বৈরী আচরণ পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া আর কিছুই থাকে না। উপন্যাসটি এমনভাবে চিত্রায়িত করেছেন যেন একবার পড়তে শুরু করলে তা শেষ না করে উঠার কোন সুযোগ নেই। লেখার আকর্ষনেই পাঠককে পরবর্তী পৃষ্ঠা উল্টাতে বাধ্য করে। কি আছে এই উপন্যাসে পাঠক নিজেই পড়ে দেখতে পারেন। উপন্যাসের শেষে নায়ক গ্রেগর মারা যায়। মারা যাওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই গ্রেগরের স্মৃতি বিস্মৃত হয়ে যায় তার বাবা, মা এবং বোনের কাছে। তারা নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখে পথ যাত্র শুরু করেন।
উপন্যাসের শেষ অংশে কাফকা লিখছেন, “মি. আর মিসেস সামসা একটু যেন অবাক হয়েই লক্ষ করলেন, দুইজনে প্রায় একইসঙ্গে, যে তাদের মেয়ের উৎসাহ- উদ্দীপনা বেশ বেড়েছে, সাম্প্রতিককালের দুঃখ-বেদনা সত্ত্বেও যার জন্য তার গাল দুটি পাণ্ডুর হয়ে গিয়েছে, সে এখন একটি সুন্দরী মেয়ে হয়ে ফুলের মতো ফুটে উঠেছে, তার দেহসৌষ্ঠবও হয়েছে চমৎকার।
ওরা একটু চুপ করে পুরোপুরি ঐকমত্যের মধ্য দিয়ে, পরস্পরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করল; তারা ঠিক করলেন যে কিছুদিনের মধ্যেই ওর জন্য একটি ভালো বর খোঁজার সময় হয়ে যাবে। এবং তাদের ওই নতুন স্বপ্ন এবং চমৎকার উদ্দেশ্যেও সমর্থনেই যে তাদের কন্যা, ওদের ভ্রমণযাত্রার সমাপ্তিতে, সকলের আগে লাফ দিয়ে উঠে তার তরুণ শরীরটা টানটান করে দাঁড়ান।”
প্রসঙ্গত, আজ বিশ্বসাহিত্যের অমর কথাশিল্পী ফ্রানৎস কাফকার জন্মদিন । ১৮৮৩ সালের ৩ জুলাই জন্ম নেওয়া এই অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান লেখক তাঁর বিশেষ ধাঁচের লেখনীর মাধ্যমে আধুনিকতাবাদ ও অস্তিত্ববাদকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন। এই কালজয়ী লেখক কাফকার জন্মদিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
লেখক, সহ-সম্পাদক, খবরওয়ালা।