খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে ইরান এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবরটি বিশ্বজুড়ে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছুড়ে দিয়েছে। পশ্চিমা শক্তিগুলো কি তবে লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি বা ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের মতো কোনো ‘মডেল’ ইরানে বাস্তবায়ন করতে চাইছে? কিন্তু গভীর বিশ্লেষণ এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাধারণ স্বৈরতন্ত্র নয়; বরং এটি একটি নিশ্ছিদ্র এবং জটিল ‘প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা’। খামেনি হত্যাকাণ্ড পশ্চিমা কৌশলের জন্য একটি বড় ধরনের ‘বুমেরাং’ বা হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
লিবিয়া বা ইরাকের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল, শীর্ষ নেতার পতন মানেই পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের ধস। কিন্তু ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের গবেষক আলি হাশেমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান গত চার দশকে এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলেছে যা যেকোনো আকস্মিক ধাক্কা সামলে নিতে সক্ষম। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি যে ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, তার মূল ভিত্তি ছিল ‘বেলায়েত-এ-ফকিহ’। এই দর্শনের মূল কথা হলো—ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্র বা ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ রক্ষা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। খোমেনির উত্তরসূরি হিসেবে খামেনি সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করেছেন, যা এখন কোনো একক ব্যক্তির অনুপস্থিতিতেও সচল থাকতে পারে।
ইরানের সংবিধানে নেতৃত্ব শূন্যতা পূরণের জন্য অত্যন্ত স্পষ্ট এবং কার্যকর একটি রোডম্যাপ রয়েছে। সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি সর্বোচ্চ নেতা মারা যান বা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হন, তবে ক্ষমতা সরাসরি একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তরিত হয়। ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির আকস্মিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং পরবর্তী দ্রুত নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে, সংকটের মুহূর্তে ইরানের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন করতে পারে।
নিচে ইরানের ক্ষমতা কাঠামোর প্রধান স্তম্ভ ও তাদের কার্যাবলি একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| প্রতিষ্ঠানের নাম | প্রধান ভূমিকা ও দায়িত্ব | গুরুত্ব |
| অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস | সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন, তদারকি ও অপসারণ। | নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। |
| গার্ডিয়ান কাউন্সিল | সংসদীয় আইন এবং প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই। | আদর্শিক বিশুদ্ধতা রক্ষা করা। |
| আইআরজিসি (IRGC) | বিপ্লব ও রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষা এবং সামরিক নিরাপত্তা। | অভ্যন্তরীণ ও সীমান্ত স্থিতিশীলতা। |
| এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিল | সংসদ ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের বিরোধ নিষ্পত্তি। | নীতি নির্ধারণী সমন্বয় সাধন। |
| বিচার বিভাগ | সংবিধান ও ইসলামি আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ। | আইনি স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। |
ইরানের এই বিশাল ক্ষমতা কাঠামোতে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর’ বা আইআরজিসি। তারা কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং ইরানের অর্থনীতি এবং রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর কোনো আঘাত এলে আইআরজিসি তাৎক্ষণিকভাবে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করে এবং মাঠপর্যায়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করে তোলে। বেইজিং বা মস্কোর প্রতিরক্ষা কৌশলের মতো ইরানও তাদের কমান্ড চেইন এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও স্থানীয় কমান্ডাররা স্বাধীনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারেন।
ইতিহাস সাক্ষী, ইরানিরা নেতৃত্বের শূন্যতাকে সবসময় জাতীয় ঐক্যের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। সাফাভি বা কাজার রাজবংশের পতনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তারা শিখেছে যে, বিশৃঙ্খলা মানেই বিদেশি শক্তির আধিপত্য। বর্তমান যুদ্ধে আয়াতুল্লাহ খামেনির মতো ব্যক্তিত্বের ‘শহীদ’ হওয়া জনমনে প্রতিশোধের স্পৃহা এবং ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। উত্তরাধিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি কোমের ধর্মীয় নেতা এবং আইআরজিসির সামরিক শক্তির একটি সূক্ষ্ম দর-কষাকষির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দেয়।
সুতরাং, খামেনি বা অন্য কোনো শীর্ষ নেতাকে হত্যা করে ইরানকে লিবিয়া বা ইরাকের মতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা সহজ হবে না। বরং এই ধরনের আগ্রাসন দেশটিকে আরও দীর্ঘমেয়াদি এবং কঠোর প্রতিরোধের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এক ভয়াবহ সামরিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।