খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
বর্ষা মৌসুম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই সিরাজগঞ্জের যমুনা তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নদীর পানি ওঠানামার মধ্যে চৌহালীসহ জেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও তীরবর্তী এলাকায় বাড়িঘর, ফসলি জমি এবং গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
চৌহালী উপজেলার চর সলিমাবাদ এলাকার বাসিন্দা মোল্লা সাইফুল ইসলামের বসতবাড়ি বৃহস্পতিবার (৪ জুন) যমুনার ভাঙনের কবলে পড়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। অটোরিকশাচালক সাইফুল ইসলামের জন্য বাড়িটিই ছিল প্রধান সম্বল। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অল্প সময়ের মধ্যেই বাড়িটি নদীতে চলে যায়।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চৌহালী উপজেলার খাস কাউলিয়া ইউনিয়নের ভূতের মোড় এবং বাগুটিয়া ইউনিয়নের বিনানুই, রেহাই পুখুরিয়া, দেওয়ানগঞ্জ বাজার ও চর সলিমাবাদসহ একাধিক এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে বসতভিটা, কৃষিজমি ও বিভিন্ন স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে যমুনার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। মাঝখানে কিছুটা কমলেও পরে আবার বৃদ্ধি পায়। তবে নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। সর্বশেষ দুই দিন ধরে পানির স্তর কিছুটা কমতে শুরু করেছে।
নদীর পানি বৃদ্ধি ও হ্রাসের ধারাবাহিক পরিবর্তনের কারণে চরাঞ্চল এবং নদীর পূর্বতীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের প্রবণতা বেড়েছে। ফলে বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই নদীতীরবর্তী জনগোষ্ঠী ভাঙনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
| এলাকা | পরিস্থিতি |
|---|---|
| চর সলিমাবাদ | দুই সপ্তাহে ৩০টির বেশি বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন |
| চর বিনানুই | চার স্থানে প্রায় ১০০ ফুট এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে |
| রেহাই পুখুরিয়া | তীব্র ভাঙন, কৃষিজমির ক্ষয় |
| দেওয়ানগঞ্জ বাজারের উত্তরাংশ | নদীভাঙন অব্যাহত |
| ভূতের মোড় | নদীতীর সংরক্ষণ বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে |
বাগুটিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য বাবুল সরকার জানান, চর বিনানুই এলাকায় নদীর পশ্চিম পাশে চারটি স্থানে প্রায় ১০০ ফুট এলাকার জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একই সঙ্গে পাশের চর সলিমাবাদ গ্রামের মোল্লা সাইফুল ইসলামের বাড়িটিও ভাঙনের কারণে হারিয়ে গেছে।
১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মতিউর রহমান বলেন, রেহাই পুখুরিয়া ও দেওয়ানগঞ্জ বাজারের উত্তরাংশে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি নদীতে চলে গেছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুস সালাম জানান, চর সলিমাবাদ বাজারসংলগ্ন এলাকায় ভাঙন শুরু হওয়ার পর গত দুই সপ্তাহে ৩০টিরও বেশি বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এ কারণে এলাকার বহু পরিবার ভাঙনের আশঙ্কায় রয়েছে।
চৌহালী ছাড়াও সিরাজগঞ্জ জেলার অন্যান্য চরাঞ্চলেও নদীভাঙন শুরু হয়েছে। কাজিপুর উপজেলার খাস রাজবাড়ী ও নাটুয়ারপাড়া, সদর উপজেলার কাওয়াকোলা এবং শাহজাদপুর উপজেলার গালা ও সনাতনী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামেও ভাঙনের খবর পাওয়া গেছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানান, গত ১৪ মে থেকে যমুনার পানি বাড়তে শুরু করে এবং দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়। তবে বুধবার থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পানির স্তর বৃদ্ধি পেলেও তা এখনো বিপৎসীমার অনেক নিচে রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, সাধারণত জুন মাসে যমুনার পানি বাড়তে শুরু করলে তীরবর্তী অঞ্চল ও চরাঞ্চলে ভাঙন দেখা দেয়। বিভিন্ন স্থান থেকে ভাঙনের তথ্য পাওয়া গেছে। চৌহালীর ভূতের মোড় এলাকায় নদীতীর সংরক্ষণ বাঁধে ভাঙন দেখা দেওয়ায় সেখানে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে প্রতিরোধমূলক কাজ চলছে। তবে চরাঞ্চলের ভাঙনরোধে কোনো বিশেষ নির্দেশনা না থাকায় ওইসব এলাকায় তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যমুনা তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকার মানুষ বসতভিটা, কৃষিজমি ও স্থানীয় অবকাঠামো রক্ষার চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন। নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকলেও ভাঙনের বিস্তার স্থানীয়ভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।