খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 26শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ১০ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থনীতি এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং প্রবৃদ্ধির ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করতে নতুন সরকারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাতটি বিশালাকার বাধা। গত সোমবার রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ’ যৌথভাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই সংকটের চিত্র তুলে ধরেছে। ‘বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পুনরুজ্জীবন: নতুন সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে জানানো হয়, সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই গর্ত থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাকে ‘সংকটাপন্ন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনের পদক্ষেপগুলোই নির্ধারণ করবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে কি না। অর্থনীতির সেই সাতটি প্রধান চ্যালেঞ্জ নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
| চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্র | সংকটের প্রকৃতি ও প্রভাব |
| ১. সামষ্টিক অর্থনীতি | উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ক্রমাগত চাপ। |
| ২. রাজস্ব ও ঋণ ব্যবস্থাপনা | রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা এবং বৈদেশিক ঋণের বোঝা বৃদ্ধি। |
| ৩. ব্যাংকিং খাত | খেলাপি ঋণের পাহাড় ও সুশাসনের অভাব; আর্থিক খাতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি। |
| ৪. রপ্তানি বৈচিত্র্য | শুধুমাত্র পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং নতুন বাজার তৈরিতে ধীরগতি। |
| ৫. বিনিয়োগ পরিবেশ | আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও হয়রানির কারণে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা। |
| ৬. জ্বালানি নিরাপত্তা | গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট এবং জ্বালানি আমদানিতে উচ্চ ব্যয়। |
| ৭. কর্মসংস্থান ও দক্ষতা | শিক্ষিত বেকারের আধিক্য এবং শিল্প খাতের উপযোগী দক্ষ জনশক্তির অভাব। |
অনুষ্ঠানে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, আমাদের নীতিনির্ধারকরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে সাময়িক সংকট মেটানোর (Short-termism) দিকে বেশি মনোযোগী। তিনি সমুদ্র বিজয়ের উদাহরণ দিয়ে বলেন, বঙ্গোপসাগরে আমাদের সীমানা নির্ধারিত হলেও নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই, যেখানে মিয়ানমার ইতিমধ্যেই বড় আকারে অনুসন্ধান কাজ শেষ করে ফেলেছে। জ্বালানি নিরাপত্তার এই অভাব পুরো শিল্প খাতকে পঙ্গু করে দিতে পারে।
অর্থনৈতিক সুশাসনের অভাবকে বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অহেতুক সময়ক্ষেপণ বা হয়রানি দুর্নীতির চেয়েও ভয়ংকর। কোনো অনুমোদন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে না পাওয়া বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে এবং উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া সরকারি বড় প্রতিষ্ঠান যেমন বিপিসি, পেট্রোবাংলা বা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ‘ফরেনসিক অডিট’ বা গভীর নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক অবস্থা জনগণের সামনে আনা এখন সময়ের দাবি।
পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ তার মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপে অর্থনীতি ঘোরানো সম্ভব নয়। সরকারের প্রথম তিন মাস বা ১০০ দিনের মধ্যে যদি বড় ধরনের সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করা যায়, তবেই বেসরকারি খাতে প্রাণের সঞ্চার হবে। পাশাপাশি জনগণের অন্তর্নিহিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মধ্যমেয়াদি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নতুন সরকারের জন্য এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা যেমন কঠিন, তেমনি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য এটিই একমাত্র পথ। আমলাতন্ত্রের সংস্কার, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশ আবারও প্রবৃদ্ধির মহাসড়কে ফিরতে সক্ষম হবে।