খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 6শে পৌষ ১৪৩২ | ২০ই ডিসেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বার শাহবাগ থেকে টিএসসি যাওয়ার পথে চারুকলা অনুষদের পর ডান দিকেই রয়েছে নান্দনিক নকশার ঢাবির কেন্দ্রীয় মসজিদ। মসজিদটিকে ‘মসজিদুল জামিয়া ঢাবি’ বলেও ডাকা হয়। মসজিদের ডান পাশে রয়েছে ঢাবি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও বামে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসে তৎকালীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার। ১৯৭৬ সালে কবিকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। ওই বছর নজরুলের স্বাস্থ্যেরও অবনতি হতে শুরু করে। জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে। একই বছরে ২৯ আগস্ট তিনি মারা যান। মারা যাওয়ার আগেই লিখে গিয়েছিলেন অমর সেই গান- ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই’। বাংলাদেশে তাঁর মৃত্যু উপলক্ষে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালিত হয়। কবির ইচ্ছানুযায়ীই তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করা হয়।
বিদ্রোহী কবির মৃত্যুর পর গত ৪৯ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কত জ্ঞানী, গুণী, মনিষী সহ আরও কত বিখ্যাত ব্যক্তির মৃত্যু হলেও কবির সমাধির পাশে সমাহিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন দেশবরেণ্য ব্যক্তি। এদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন (২৯ ডিসেম্বর ১৯১৪-২৮ মে ১৯৭৬), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের প্রথম সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী (২৩ নভেম্বর ১৯২২-১৭ জানুয়ারি ১৯৭৮), বাংলাদেশের অন্যতম পদার্থবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আব্দুল মতিন চৌধুরী (১ মে ১৯২১-২৪ জুন ১৯৮১), পটুয়া শিল্পী খ্যাত বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও বাংলাদেশের বর্তমান পতাকার প্রণেতা কামরুল হাসান (২ ডিসেম্বর ১৯২১-২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮) ও সর্বশেষ ঢাবি’র সাবেক ভিসি বিশিষ্ট
শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী এম ওসমান গণি (১ মার্চ ১৯১২-২১ জুলাই ১৯৮৯)।
এতোকাল কারো জায়গা না হলেও ওসমান হাদির পরিবার, বর্তমানে ইসলামি ছাত্র শিবিরের নিয়ন্ত্রনাধীন ডাকসু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই যোদ্ধা শহীদ ওসমান হাদিকে (৩০ জুন ১৯৯৩-১৮ ডিসেম্বর ২০২৫) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে সমাহিত করা হচ্ছে। শরিফ ওসমান হাদিই একমাত্র তরুণ যিনি কেবল একজন এক্টিভিস্ট হিসেবে ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই এর সাহসী সৈনিক হিসেবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সারাদেশের মানুষের কাছে টিভি টকশো আর ইউটিউবে তার চাঁছাছোলা কথার জন্য পরিচিত হয়ে ওঠার সৌভাগ্য অর্জন করেন। আবার এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ সমাধিস্থলে বিখ্যাত ব্যক্তিদের সারিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার সুযোগও অর্জন করেছেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এ এক বিরল ঘটনা।
শরিফ ওসমান হাদি গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনে প্রকাশ্য দিবালোকে আততায়ীর হাতে মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে প্রথমে ঢাকা ও পরবর্তীতে এয়ার এম্বুলেন্সে সিংগাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা অবস্থায় সারাদেশের মানুষ তার সুস্থতার জন্য দোয়া করে আসছিলো। বেগম খালেদা জিয়া ছাড়া এমনটা নিকট অতীতে দেখা যায়নি।
জুলাই বিপ্লব অতিক্রমের পরও চলমান অস্থির দিনগুলোতে যখন মানবিকতা ছাপিয়ে আতঙ্ক আচ্ছন্ন করে ফেলেছে মানুষের বিবেককে, চারদিকে কিসের যেন চাপা আতংক, বিভাজনের প্রাচীরে একটা দেশ ক্ষতবিক্ষত— এ সময়ে হাদি হয়ে উঠেছিলেন অন্যতম আশার ভরসা, প্রতিবাদের বিদ্রোহী স্ফুলিঙ্গের প্রতীক। মঞ্চে কিংবা মাইকের মাইক্রোফোনের সামনে তার কণ্ঠে ছিল না বিন্দুমাত্র জড়তা, দৃষ্টিতে ছিল না অণু পরিমাণও ভয় বা সংশয়। তিনি বিশ্বাস করতেন—সত্য বলার ঝুঁকি আছে ঠিকই, তবে নিশ্চুপ থাকার দায় আরও ভয়াবহ। তবে একসময় মাদ্রাসার ছাত্র ও মাদ্রাসার শিক্ষকের সন্তান হয়েও হাদীর মুখের অশ্রাব্য গালগালাজ আর শ্লোগান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে তিনি এটাকে ‘প্রতিবাদের মহাকাব্য’ বলায় অনেকে তার প্রতি মারাত্মক ক্ষুব্ধও ছিলেন।
আধিপত্যবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে চলার পথে অবিচল থেকে তিনি লালন করেছেন ন্যায়ের ওপর দাঁড়ানো এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দিতে এখন সময় হয়েছে সম্মিলিতভাবে দেশের সকল বিভাজনকে উপরে ফেলে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে স্বীকার করা সকল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিগুলোর সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার। তা না হলে তার ‘ইনসাফ ভিত্তিক’ সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দূর থেকে আরও অধিকতর দূরে চলে যাওয়ার আশংকা রয়েই যাবে! ওপারে ভালো থাকুন হাদি।
মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ
সমাজ বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক।