রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলার বিচারিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ায় আদালত আগামী ৭ জুন রায়ের দিন ধার্য করেছেন। ঘটনাটি প্রকাশের পর থেকেই দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং শিশুদের নিরাপত্তা ও নারী-শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।
বৃহস্পতিবার ঢাকার শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে আসামিদের উপস্থিতিতে যুক্তিতর্ক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানির একপর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু আদালতে প্রধান আসামি সোহেল রানার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পাঠ করে শোনান। আদালতে প্রকাশ্যে এই জবানবন্দি উপস্থাপনের ঘটনাটি মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর দেওয়া জবানবন্দিতে সোহেল রানা নিজের অপরাধের বর্ণনা দেন। তিনি জানান, একই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে বসবাসকারী রামিসাকে কৌশলে নিজের কক্ষে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করেন। পরে শিশুটি চিৎকার শুরু করলে তাকে চুপ করানোর চেষ্টা করা হয়। ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে অপরাধ গোপনের উদ্দেশ্যে আরও ভয়াবহ পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।
মামলার নথি অনুসারে, ঘটনার দিন রামিসা নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার ও প্রতিবেশীরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে সন্দেহজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আসে। পরে পুলিশ অভিযানে গিয়ে শিশুটির খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে। ঘটনাটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।
শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। আদালত উভয় পক্ষের যুক্তি, সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক তথ্য এবং তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে রায় ঘোষণার জন্য ৭ জুন দিন নির্ধারণ করেন।
মামলার অগ্রগতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো—
বিষয়
তথ্য
ভুক্তভোগী
রামিসা আক্তার (৮)
ঘটনার স্থান
পল্লবী, ঢাকা
মরদেহ উদ্ধারের তারিখ
১৯ মে
প্রধান আসামি
সোহেল রানা
সহ-আসামি
স্বপ্না আক্তার
সাক্ষীর সংখ্যা
১৬ জন
বিচারিক আদালত
শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল
রায় ঘোষণার তারিখ
৭ জুন
এর আগে মামলায় রামিসার বাবা-মা, বোন, স্বজন, প্রতিবেশী, প্রত্যক্ষদর্শী এবং তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৬ জন সাক্ষ্য প্রদান করেন। তাদের সাক্ষ্যে ঘটনার বিভিন্ন দিক উঠে আসে, যা তদন্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছে।
শিশু নির্যাতন ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিচালনা করেছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের মামলায় আদালতের রায় শুধু ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে না, বরং ভবিষ্যতে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে।
রামিসার পরিবারের সদস্যরা আদালতের কাছে সর্বোচ্চ শাস্তির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মী ও শিশু অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক নজরদারি এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এখন সবার দৃষ্টি ৭ জুনের রায়ের দিকে, যা এই আলোচিত মামলার বিচারিক পরিণতি নির্ধারণ করবে।