খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় অজীবন বীমা খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনে সম্মত হয়েছে সরকার। নতুন সমঝোতা অনুযায়ী, অজীবন বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যবসার অন্তত ৫০ শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি)-এর কাছে পুনর্বীমা করানোর বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হবে। এর ফলে বীমা খাতে প্রতিযোগিতা বাড়বে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বৈচিত্র্য আসবে এবং আন্তর্জাতিক পুনর্বীমা বাজারে বাংলাদেশের সংযোগ আরও বিস্তৃত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পুনর্বীমা মূলত ‘বীমা কোম্পানির জন্য বীমা’। বড় অঙ্কের ক্ষতি—যেমন কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, জাহাজে পণ্য ক্ষতি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত দাবি—পরিশোধে সক্ষমতা বাড়াতে বীমা কোম্পানিগুলো তাদের ঝুঁকির একটি অংশ অন্য বীমা বা পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। বিদ্যমান আইনে অজীবন বীমাকারীদের মোট পুনর্বীমা ব্যবসার অন্তত অর্ধেক এসবিসির কাছে হস্তান্তর করতে হতো; বাকি অংশ দেশি বা বিদেশি পুনর্বীমাকারীদের সঙ্গে করা যেত।
গত বছরের নভেম্বরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) বীমা করপোরেশন আইন, ২০১৯–এর সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধনের প্রস্তাব দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে এ বিষয়টি শর্তের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর প্রাথমিকভাবে ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া হলেও পরে তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়, যা আগস্ট থেকে কার্যকর হয়। চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত চুক্তিতে শুল্কহার আরও কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এই শুল্কহ্রাসের বিনিময়ে বীমা খাতসহ কয়েকটি খাতে নীতিগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশ।
বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বাধ্যতামূলক পুনর্বীমা বিধান শিথিলের দাবি জানিয়ে আসছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, এসবিসির কাছে জমা দেওয়া পুনর্বীমা দাবির বড় অংশ নিষ্পত্তি হতে বিলম্ব হয়; কিছু দাবি ২০২০ সাল থেকে ঝুলে আছে বলে দাবি করা হয়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দিতে বেসরকারি কোম্পানিগুলো চাপের মুখে পড়ে। অন্যদিকে, এসবিসি এই বিধান বাতিলে আপত্তি জানিয়েছে এবং এফআইডিকে পাঠানো এক চিঠিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
এসবিসির সাম্প্রতিক আর্থিক চিত্রে দ্বৈত প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৪ অর্থবছরে (ডিসেম্বর শেষে) প্রতিষ্ঠানটি কর পরবর্তী নিট মুনাফা করেছে ২৯৭.৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। তবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের অনাদায়ী ক্ষতি যোগ করলে মোট সমন্বিত আয় দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক। এতে প্রতি শেয়ারে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
| সূচক | ২০২৩ | ২০২৪ | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| কর পরবর্তী নিট মুনাফা | ২৬২.৫ কোটি টাকা | ২৯৭.৬ কোটি টাকা | +১৩% |
| অনাদায়ী শেয়ার ক্ষতি | — | ৮৬২ কোটি টাকা | — |
| প্রতি শেয়ারে আয় (ইপিএস) | ৫২.৫১ টাকা | ৩৩.০৭ টাকা | −৩৭% |
নীতিনির্ধারকদের মতে, বাধ্যতামূলক পুনর্বীমা বিধান প্রত্যাহার হলে অজীবন বীমা কোম্পানিগুলো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আরও নমনীয়তা পাবে এবং আন্তর্জাতিক পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক দরকষাকষির সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত এসবিসির সক্ষমতা বাড়াতে করপোরেট সংস্কার, দাবি নিষ্পত্তির গতি বাড়ানো এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আধুনিকীকরণ জরুরি হয়ে উঠবে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই আগামী দিনে বীমা খাত সংস্কারের বড় চ্যালেঞ্জ।