খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি ২০২৬
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর হাতে আটকের পর দেশটির জ্বালানি সম্পদ নিয়ে বৈশ্বিক উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিলেও তার কড়া জবাব দিয়েছেন দেশটির বর্তমান অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো বিদেশি শক্তি বা এজেন্ট ভেনেজুয়েলা শাসন করছে না।
ভেনেজুয়েলার তেল ও ট্রাম্পের পরিকল্পনা
সম্প্রতি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলা বর্তমানে ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল ওয়াশিংটনকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ তেল ইতিমধ্যে উত্তোলন করা অবস্থায় রয়েছে এবং এর বিক্রয়লব্ধ অর্থ ট্রাম্প নিজেই নিয়ন্ত্রণ করবেন বলে জানান। তিনি এই অর্থ ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছেন। মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটকে এই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেল ও বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিচে সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| মোট তেল মজুত (২০২৩) | ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল (বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ)। |
| প্রস্তাবিত তেল সরবরাহ | ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল। |
| বর্তমান বাজারমূল্য (যুক্তরাষ্ট্র) | ব্যারেলপ্রতি ৫৬ ডলার (১ ডলার হ্রাস পেয়েছে)। |
| ভেনেজুয়েলার বিক্রয়মূল্য | ব্যারেলপ্রতি ৫৫ ডলার। |
| সম্ভাব্য অতিরিক্ত আয় | প্রায় ২৭৫ কোটি মার্কিন ডলার। |
| প্রধান মার্কিন কোম্পানি | শেভরন (নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সীমিত কার্যক্রম)। |
বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা ও অস্পষ্টতা
ট্রাম্পের এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেললেও বিশেষজ্ঞরা এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বেকার ইনস্টিটিউটের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মার্ক ফিনলে জানান, ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল শুনতে অনেক মনে হলেও বৈশ্বিক চাহিদার তুলনায় তা সামান্য। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ব্যবহার করে। ফলে এই তেল যদি এক বছরের জন্য হয়, তবে তা মার্কিন বাজারে বিশেষ কোনো প্রভাব ফেলবে না। অন্যদিকে, ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনের বিশেষজ্ঞ স্কট মন্টগোমেরি মনে করেন, অন্য একটি দেশের তেলের অর্থ যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে দুই দেশের জনগণের মধ্যে বণ্টন করবে, তার কোনো আইনগত বা ঐতিহাসিক নজির নেই।
সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেলসি রদ্রিগেজ
গত শনিবার কারাকাসে নাটকীয় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প দাবি করছেন যে, ভেনেজুয়েলা এখন তাঁর নিয়ন্ত্রণে। তবে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ও মাদুরোর প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, “বিদেশি কোনো শক্তি আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করছে না। ভেনেজুয়েলার সরকারই স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা করছে।”
বিক্ষোভ ও জনরোষ
কারাকাসে দেলসি রদ্রিগেজের সমর্থনে হাজার হাজার নারী রাজপথে মিছিল করেছেন। একইসঙ্গে মাদকবিরোধী বাহিনীর সদস্যরাও মাদুরোর পক্ষে সংহতি প্রকাশ করেছেন। শুধু ভেনেজুয়েলায় নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতেও ট্রাম্পের এই আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। সেখানে বিক্ষোভকারীরা ট্রাম্পের ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ডে তাঁর কঠোর সমালোচনা করেন।
বর্তমানে নিকোলাস মাদুরো নিউ ইয়র্কের একটি আটককেন্দ্রে বন্দি রয়েছেন। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ দখলের তোড়জোড়, অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার জনগণের সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই—সব মিলিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির ভবিষ্যৎ এখন এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।