খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
গত এক বছর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ছিল এক কঠিন পরীক্ষার সময়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকট—সবকিছু মিলিয়ে অর্থনীতি পরিচালনায় সরকারকে নিতে হয়েছে একের পর এক কঠোর ও অপ্রিয় সিদ্ধান্ত। সরকারি সংস্থা ও নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সময়ে অর্থনীতি একদিকে গভীর সংকট সামাল দিয়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে খুব একটা স্বস্তি আনতে পারেনি।
বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। চাল, তেল, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে বারবার উত্থান-পতনে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চাপে রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম হওয়ায় মানুষের প্রকৃত আয় ক্রমাগত কমছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে, যেখানে একই সময়ে মজুরি প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ০৪ শতাংশ।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসে ব্যাংকিং খাতের গভীর সংকট। বিগত সরকারের সময় দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, অব্যবস্থাপনা ও অর্থ পাচারের তথ্য চাপা থাকলেও ২০২৫ সালে এসে তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের মোট বিতরণকৃত ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখন খেলাপি। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে নতুন করে গঠিত হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি ইসলামী ব্যাংক।
তবে সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছু স্বস্তির জায়গাও তৈরি হয়েছে। প্রবাসী আয় বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল হওয়ায় ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা এক বছর আগে ছিল প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে বিনিয়োগ পরিস্থিতি এখনো হতাশাজনক। ব্যবসায়ীদের মধ্যে অস্থিরতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ।
এনবিআরের আন্দোলন রাজস্ব আদায়ে বড় ধাক্কা দেয়। দেড় মাসের আন্দোলনে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নেও ধীরগতি অব্যাহত রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই। তবে রিজার্ভ, রেমিট্যান্স ও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার যে প্রচেষ্টা চলছে, সেটি ভবিষ্যতের জন্য কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে।
| সূচক | সর্বশেষ অবস্থা |
|---|---|
| মূল্যস্ফীতি (নভেম্বর) | ৮.২৯% |
| মজুরি প্রবৃদ্ধি | ৮.০৪% |
| বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ | ৩২.৫৭ বিলিয়ন ডলার |
| বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি | ৬.২৩% |
| খেলাপি ঋণের অনুপাত | ৩৩%+ |
| এডিপি বাস্তবায়ন (জুলাই–নভেম্বর) | ১১.৭৫% |
| প্রবাসী আয় (জুলাই–নভেম্বর) | ১৩.০৪ বিলিয়ন ডলার |
| বৈদেশিক কর্মসংস্থান | ৫ লাখ কর্মী |