খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 5শে কার্তিক ১৪৩২ | ২০ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে শনিবার (১৮ অক্টোবর) ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড দেশের রপ্তানি খাতকে চরম সংকটে ফেলেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী হাজার কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের অপরিহার্য কাঁচামাল, রপ্তানির জন্য প্রস্তুত পোশাক এবং অসংখ্য মূল্যবান স্যাম্পল আগুনে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান ক্ষতিগ্রস্ত স্থান পরিদর্শনের পর জানান, এই অগ্নিকাণ্ড অত্যন্ত দুঃখজনক। দেশের রপ্তানি বাণিজ্য, বিশেষ করে পোশাক শিল্প মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। পুড়ে যাওয়া সামগ্রীর মধ্যে উচ্চমূল্যের কাঁচামাল ও স্যাম্পল ছিল, যা নতুন ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনাও হুমকির মুখে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের সদস্য কারখানাগুলোর মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি কারখানা বিমানযোগে পণ্য রপ্তানি করে। তাই ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক হতে পারে। ইতোমধ্যে সদস্যদের কাছ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের তালিকা চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য অনলাইন পোর্টাল চালু করা হয়েছে।”
বিজিএমইএ পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, “আমরা ভেতরে গিয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেখেছি। পুরো ইমপোর্ট সেকশন সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। তবে প্রকৃত ক্ষতি নির্ধারণে আরও কিছুদিন লাগবে।” তিনি আরও জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা দ্রুত আমদানি কার্যক্রম পুনরায় চালুর আশ্বাস দিয়েছেন এবং ৩ নম্বর টার্মিনালের নতুন স্থানে আমদানি পণ্য রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পরিদর্শনের পর ইনামুল হক খান জানান, পুরো আমদানি বিভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে। এটি পুনরায় সচল করতে কমপক্ষে ১৫ দিন থেকে ১ মাস সময় লাগতে পারে।
ফয়সাল সামাদ আরও জানান, কাস্টমসের সঙ্গে যৌথভাবে একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হচ্ছে। শুক্রবার ও শনিবারও কাজ চলবে, যাতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে আর দেরি না হয়।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা মনে করছেন, এই অগ্নিকাণ্ড শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট করতে পারে। বিমানযোগে রপ্তানিকৃত পোশাক সাধারণত অতি জরুরি অর্ডার হয়, যেখানে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি চালান মাত্র ২৪ ঘণ্টা দেরি হলে পুরো অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি থাকে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন দুর্ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। সাম্প্রতিক সময়ে গার্মেন্টস কারখানা ও বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড উদ্যোক্তাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এটি নিছক দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা, তা দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন।”
উদ্যোক্তাদের ধারণা, সরাসরি আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রাথমিকভাবে ১০০ কোটি টাকারও বেশি হলেও এর প্রভাব আরও বিস্তৃত। এতে ভবিষ্যৎ অর্ডার, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
অগ্নিকাণ্ডের পর অর্থ মন্ত্রণালয় একটি পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে, যা দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে প্রতিবেদন দেবে। কমিটির আহ্বায়ক অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটওয়ারী এবং সদস্যরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও ঢাকা কাস্টম হাউসের কর্মকর্তারা।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে নির্দেশ দিয়েছেন—আমদানি পণ্য খালাসের সময়সীমা ৭২ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৩৬ ঘণ্টা করা হবে। এছাড়া কাস্টমসের সঙ্গে যৌথভাবে একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হবে, যাতে পণ্যের জট না হয় এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম দ্রুত পুনরায় শুরু করা যায়।
বিজিএমইএ সরকারের কাছে চার দফা দাবি জানিয়েছে—
১. অগ্নিকাণ্ডটি দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা, তা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত করা।
২. ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও সহযোগিতা প্রদান।
৩. বন্দরের চলমান পরিস্থিতি নির্বিশেষে অন্যান্য শিপমেন্ট কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা।
৪. বিমানবন্দরের সংবেদনশীল এলাকায় রপ্তানি পণ্যের নিরাপত্তা জোরদার করে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা পুনঃস্থাপন।
সংগঠনটি সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছে—বিমানবন্দরে আমদানিকৃত পোশাক শিল্পের কাঁচামাল ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে খালাস সম্পন্ন করতে।
বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সচিব মেজর (অব.) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “এই পরিস্থিতিতে শিল্পের ক্ষতি কমাতে আমরা সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছি। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিলে রপ্তানি প্রবাহ আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে বলে আমরা আশা করছি।”
অগ্নিকাণ্ডের পর এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) সোমবার (২০ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সাংবাদিকদের উপস্থিত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা সতর্ক করে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড দেশের পোশাক খাত ও অর্থনীতির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা অগ্নিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, নিরাপত্তা পুনর্মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ দেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ড কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ ব্যবসা, আন্তর্জাতিক আস্থা ও রপ্তানি প্রবাহের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার বেশি ধরা হলেও, প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ ও ক্ষতিপূরণ নির্ভর করছে সরকারের গঠিত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর। দেশের রপ্তানি খাতের স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সুনাম বজায় রাখতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ ও সতর্কতা অপরিহার্য।
খবরওয়ালা/টিএসএন