খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৪ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিরা এখন দ্বৈত আইনি চাপে পড়ছেন, যা আইন বিশেষজ্ঞরা ‘দ্বিগুণ শাস্তি’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। অনেক ক্ষেত্রে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি তাদের সম্পদ হারানোর পরও ক্রমাগত শাস্তির মুখোমুখি হন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান (NBFI) প্রথমে নাগরিক আদালতে ঋণ আদায়ের মামলা করেন এবং একই সাথে চেক অদায়কতার (dishonoured cheque) কারণে আলাদা ফৌজদারি দায়েরও প্রবর্তন করেন। এর ফলে এক ঋণসম্পর্কিত মামলায় একই ব্যক্তিকে একাধিকবার শাস্তি ভোগ করতে হয়।
আইনজীবী এমরান আহমেদ ভূঁইয়া বলেন,
“ব্যাংকগুলি ঋণ আদায়ের জন্য নাগরিক মামলা চালাচ্ছে, কিন্তু একই ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি চেক অদায়কতার মামলায় পুনরায় শাস্তি পাচ্ছেন। এটি আইনি দিক থেকে অত্যন্ত আগ্রাসী কৌশল।”
| বছর | ব্যাংক/এনবিএফআই চেক মামলা | অনুমানকৃত ঋণের পরিমাণ (বিলিয়ন টাকা) |
|---|---|---|
| ২০২৪ | ২৬,০০০ | ২০,০০০ |
| ২০২৫ (জানু–নভে) | ২৯,০০০ | ২৪,০০০ |
| মোট মুলতুবি | ১,৭৬,০০০ | ২৪৪,০০০ |
সাধারণ ঋণগ্রস্তরাও নিরাপদ নন। নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী সাদিকুল ইসলাম জিবন ২০১২ সালে ৭ কোটি টাকা ঋণ নেন। ২০১৫ সালে ব্যাংক ৩০টি পৃথক চেক মামলা সহ নাগরিক মামলা দায়ের করে। ২০২১ সালে ঋণ আদালত ব্যাংকের পক্ষে রায় দেয় এবং তার সম্পদ জব্দ করে। ২০২২ সালে তিন বছরের কারাদণ্ড ও ১১ কোটি টাকা ফেরত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে হাই কোর্ট রায় স্থগিত ও চেক মামলা বাতিল করেন।
আইনবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ছোট ও মাঝারি ঋণগ্রস্তরাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন। বড় ঋণগ্রহণকারীরা চেকের মাধ্যমে সহজে লেনদেন সামলাতে পারেন। ২০২৪–২০২৫ সালের মধ্যে ১,৭২৮ চেক অদায়কতা মামলার মধ্যে ৯৮৩টি ব্যাংক প্রবর্তিত, যার ঋণের পরিমাণ প্রায় ২০০ বিলিয়ন টাকা।
হাই কোর্টের হস্তক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, লিপু রহমানের চেক মামলা, যা ৬৫ কোটি টাকার ঋণের জন্য ৯৭.৪ কোটি টাকার চেক সম্পর্কিত ছিল, বাতিল হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারি–নভেম্বরের মধ্যে ১৯,৪০৬ চেক মামলা স্থগিত করা হয়, যা প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন টাকার ঋণের সঙ্গে যুক্ত।
নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত অস্পষ্টতা এখনো রয়ে গেছে। ২০২২ সালের হাই কোর্ট রায়ে বলা হয়েছিল, ঋণ আদায়ের জন্য চেক মামলা একমাত্র ভিত্তি হওয়া উচিত নয়। তবে আপিল বিভাগ এই নির্দেশ স্থগিত করে। বাংলাদেশ ব্যাংক পোষ্ট-ডেটেড চেক গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে, তবু চেক অদায়কতা মামলা দায়েরে কোনো আইনি বাধা নেই।
বর্তমানে, বাংলাদেশের ঋণগ্রস্তরা দুই ধরনের আইনি ঝুঁকির সম্মুখীন: একদিকে সম্পদ হারানো, অন্যদিকে ফৌজদারি দায়। স্পষ্ট বিধিমালা ও আইনি সুরক্ষা না থাকায় তাদের অবস্থান এখন অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ।