খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সুদূর প্রবাসের যান্ত্রিক জীবনে একখণ্ড বাংলাদেশ যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। গত রবিবার ব্যাংকসটাউনের ব্রায়ান ব্রাউন থিয়েটারে আয়োজিত এক অনন্য সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় মাটির গানে মুগ্ধ হলেন খোদ অস্ট্রেলীয় নীতিনির্ধারকেরা। এদিন ‘জলের গান’ ব্যান্ডের দুই দিকপাল রাহুল আনন্দ ও কনক আদিত্যর পরিবেশনায় তৈরি হয়েছিল এক মায়াবী আবহাওয়া, যেখানে সুরের জাদুতে ভাষা ও ভৌগোলিক সীমানা একাকার হয়ে গিয়েছিল।
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিলেন আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথি অস্ট্রেলীয় লিবারেল পার্টির প্রভাবশালী নেতা ও সংসদ সদস্য ওয়েন্ডি লিন্ডসে। রাহুল আনন্দ যখন তাকে মঞ্চে আহ্বান জানালেন, তিনি সোৎসাহে দর্শকদের সামনে এসে দাঁড়ান। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তিনি বলেন, “আমি হয়তো তোমাদের ভাষা বুঝি না, কিন্তু এই সুরের ভেতর দিয়ে মাটির যে টান প্রকাশিত হচ্ছে, তা আমি হৃদয়ে অনুভব করছি।”
এরপর কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই কেবল রাহুল আনন্দের মায়াবী বাঁশির সুরের ছন্দে কণ্ঠ মেলান তিনি। তিনি গেয়ে শোনান নিজের দেশের কিংবদন্তি শিল্পী ওয়েন্ডি ম্যাথিউজের জনপ্রিয় গান ‘অ্যাজ জেন্টল টাইডস গো রোলিং বাই’। একজন ভিনদেশি জনপ্রতিনিধির এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং বাংলার লোকজ সুরের সাথে পাশ্চাত্য সংগীতের এই মিতালি দর্শকদের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা উপহার দেয়।
এই অনুষ্ঠানেই প্রথমবারের মতো দর্শকদের সামনে পরিবেশিত হয় জলের গানের একদম নতুন সৃষ্টি ‘ঝুকুর ঝুক’। রাহুল আনন্দ নিজের হাতে তৈরি বিচিত্র সব বাদ্যযন্ত্র—শুকতারা, মমতা, ঘুঙুর ও মন্দিরা নিয়ে যখন মঞ্চে ওঠেন, তখন প্রেক্ষাগৃহে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। তার সাথে গিটার ও কাহনে সঙ্গত করেন সিডনির রক ক্যাসেট ব্যান্ডের তানভির আহসান ও অমিত দাশ। পারকাশন ও ঢোলের জাদুতে পুরো মিলনায়তন মাতিয়ে তোলেন নামিদ ফারহান ও লিন্টাস প্যারেরা। করতালের তালে প্রাণ সঞ্চার করেন রহমান রে।
অনুষ্ঠান ও পরিবেশনার এক নজরে সারসংক্ষেপ:
| আয়োজনের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| অনুষ্ঠানের নাম | চাঁদের হাট-এর আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান |
| ভেন্যু | ব্রায়ান ব্রাউন থিয়েটার, ব্যাংকসটাউন, সিডনি |
| প্রধান শিল্পী | রাহুল আনন্দ ও কনক আদিত্য (জলের গান) |
| বিশেষ আকর্ষণ | ওয়েন্ডি লিন্ডসে (এমপি, অস্ট্রেলীয় লিবারেল পার্টি) |
| নতুন গান | ঝুকুর ঝুক |
| সহযোগী ব্যান্ড | রক ক্যাসেট ও চারু ব্যান্ডের সদস্যরা |
| উদ্দেশ্য | জনকল্যাণমূলক ও অভিবাসী অধিকার রক্ষা |
সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক সংগঠন ‘চাঁদের হাট’-এর আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে এই জমকালো সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়। সংগঠনটির অন্যতম উদ্যোক্তা ফাহাদ আসমা জানান, তাদের এই উদ্যোগ মূলত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং অভিবাসীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করবে। সম্পূর্ণ ক্রাউড ফান্ডিং বা গণ-তহবিলের মাধ্যমে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের যাবতীয় লভ্যাংশ জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা হবে। শিল্প ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনের মাধ্যমে মানুষের দ্বারে সেবার বার্তা পৌঁছে দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য।
জলের গানের অন্যতম শিল্পী কনক আদিত্য জানান, তারা মূলত অস্ট্রেলিয়ার সিডনিসহ চারটি শহরে গান ও আড্ডার এই সফরটি সাজিয়েছেন। সিডনির দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ততায় তারা আপ্লুত। দর্শক সারিতে থাকা পূরবী পারমিতা বোস তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “প্রবাসের এই কঠোর ব্যস্ত জীবনে রাহুলের বাঁশির সুর ছিল এক পশলা প্রশান্তির বৃষ্টির মতো।”
পড়ন্ত বিকেলের সেই ছায়াময় সন্ধ্যায় বাঁশি, ঢোল, শঙ্খ ও খঞ্জনির সম্মিলিত ধ্বনি সিডনির বুকে জীবন্ত করে তুলেছিল বাংলাদেশের সোঁদা মাটির ঘ্রাণ আর আদিম সেই শ্যামল প্রকৃতিকে।