খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৭ মে ২০২৫
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক জন্মলগ্ন থেকেই উত্তেজনাপূর্ণ। স্বাধীনতার সময়কার বিভাজনের রক্তাক্ত ইতিহাস থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ, যুদ্ধ ও সীমান্ত উত্তেজনা থামেনি। কাশ্মীর ইস্যুকে কেন্দ্র করে বারবার দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ হয়েছে, যার প্রভাব শুধু উপমহাদেশেই নয়, ছড়িয়েছে গোটা বিশ্বে। সময়ের পরিক্রমায় সংঘর্ষের ধরন পাল্টালেও দ্বন্দ্বের শিকড় থেকে যায় একই—অধিকার, প্রতিশোধ এবং আস্থার সংকট। ২০২৫ সালে পেহেলগাম হামলার পর নতুন করে যে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা আবারও বিশ্বের সামনে প্রশ্ন তুলছে—এই দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের দ্বন্দ্ব কি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের পথে যাবে?
ইতিহাস
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারত ও পাকিস্তান আলাদা দুটি রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে স্বাধীনতার কয়েক মাসের মধ্যেই কাশ্মীর ইস্যু ঘিরে দুই দেশের মধ্যে প্রথম সামরিক সংঘর্ষ শুরু হয়।
১৯৪৯ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও, কাশ্মীর বিভক্ত থাকা সত্ত্বেও উভয় দেশই পুরো অঞ্চলটির ওপর নিজেদের দাবি বজায় রাখে, যা পরবর্তীতে একাধিক সংঘর্ষের উৎস হয়ে ওঠে।
বড় বড় সংঘর্ষের ধারাবাহিকতা
১৯৬৫ সালের যুদ্ধ: পাকিস্তান ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে অনুপ্রবেশ করলে স্থল ও আকাশপথে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়।
১৯৭১ সালের যুদ্ধ: তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) ভারতীয় সহায়তায় স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে সংঘর্ষে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধ: পাকিস্তানি বাহিনী গোপনে কাশ্মীরের কারগিল অঞ্চলে প্রবেশ করলে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হয়। উভয় দেশই তখন পারমাণবিক শক্তিধর ছিল, যা আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনা
২০১৬ সালের উরি হামলা: সেনাঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ চালায় পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে।
২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলা ও বালাকোট বিমান হামলা: আত্মঘাতী হামলার পর ভারত বিমান হামলা চালায় বালাকোটে, যার জবাবে পাকিস্তানও বিমান হামলা করে। এতে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা প্রায় তৈরি হয়।
বর্তমানে ফের উত্তপ্ত কাশ্মীর ও যুদ্ধের আশঙ্কা
সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল, যখন ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগাম অঞ্চলে একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন পর্যটক নিহত হন। ভারত এ হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’কে দায়ী করে।
এর জবাবে মঙ্গলবার (৬ মে) মধ্যরাতে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে এক সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ও পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ভারতীয় বাহিনীর দাবি, এই হামলাগুলো ছিল কেবলমাত্র সন্ত্রাসী ঘাঁটি লক্ষ্য করে। তবে পাকিস্তান পাল্টা অভিযোগ করে যে, এতে বেসামরিক এলাকা ও ধর্মীয় স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এবং ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।
পাকিস্তানও দাবি করে তারা ৫টি ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে, ভারত জানায় যে পাকিস্তানি গোলাবর্ষণে ১০ জন ভারতীয় বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
এই ঘটনার জেরে ভারত সারা দেশে ‘অপারেশন অভ্যাস’ নামে এক বিশাল জরুরি প্রস্তুতি মহড়া শুরু করেছে, যা ১৯৭১ সালের পর সবচেয়ে বড় জাতীয় মহড়া হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এতে বিমান হামলার সতর্কতা, ব্ল্যাকআউট প্রশিক্ষণ, এবং আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জলচুক্তি নিয়েও নতুন সংঘাত
এ ছাড়াও ভারত ইন্দাস জলচুক্তি আংশিক স্থগিত করেছে এবং চেনাব নদীর পানি প্রবাহ কমিয়ে দেয়, যা পাকিস্তানের কৃষি ও জল সরবরাহে বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পাকিস্তান এই পদক্ষেপকে চুক্তিভঙ্গ হিসেবে দেখছে এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছে, পরিস্থিতি আরও অবনত হলে “সর্বাত্মক প্রতিক্রিয়া” জানানো হবে – যা পারমাণবিক উত্তেজনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও জাতিসংঘ দুই দেশকে শান্ত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে যে, যদি পরিস্থিতি এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পুরোমাত্রার যুদ্ধ শুরু হতে পারে–যা পারমাণবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কাও ডেকে আনতে পারে।
খবরওয়ালা/আরডি