খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা প্রশমন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকট নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি নতুন শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, তারা যুদ্ধ সমাপ্তি এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় অবাধ ও সুরক্ষিত বাণিজ্যিক যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত করতে প্রস্তুত। তবে এই আলোচনার ক্ষেত্রে পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বিতর্কিত বিষয়টি আপাতত স্থগিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সোমবার (২৭ এপ্রিল, ২০২৬) মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত আরও দুটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সম্প্রতি পাকিস্তান সফরকালে এই পরিকল্পনাটি উত্থাপন করেন। তিনি ইসলামাবাদে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর (পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক এবং কাতার) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে এই নতুন রূপরেখাটি তুলে ধরেন। আরাগচি সরাসরি স্বীকার করেছেন যে, ওয়াশিংটনের পারমাণবিক দাবিগুলো কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের মধ্যে এখনও কোনো চূড়ান্ত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই অভ্যন্তরীণ জটিলতা এড়াতেই তেহরান কৌশলগতভাবে শান্তি আলোচনাকে পারমাণবিক ইস্যু থেকে আলাদা রাখতে চাইছে।
পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হোয়াইট হাউসে পাঠানো ইরানের এই নতুন প্রস্তাবে মূলত তিন ধাপের একটি বিশদ পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। এই ধাপগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক চিত্রে আমূল পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
১. আইনি নিশ্চয়তা ও যুদ্ধের অবসান: প্রথম ধাপে ইরান দাবি করেছে যে, ইরান এবং লেবাননের ওপর ভবিষ্যতে আর কোনো সামরিক হামলা বা আগ্রাসন চালানো হবে না—এমন একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইনি নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। এর মাধ্যমে অঞ্চলটিতে চলমান সশস্ত্র সংঘাতের স্থায়ী সমাপ্তি টানার প্রস্তাব করা হয়েছে।
২. হরমুজ প্রণালী ও অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার: দ্বিতীয় ধাপে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালী পরিচালনার জন্য একটি নতুন আইনি কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে এই প্রণালীটি পরিচালনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় ইরান। বিনিময়ে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধগুলো সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহারের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
৩. পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত আলোচনা: উপরোক্ত দুটি ধাপ অর্থাৎ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হওয়ার পর তৃতীয় ধাপে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে আগ্রহী তেহরান। উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে এবং সঞ্চিত সকল সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক তদারকিতে হস্তান্তর করতে হবে। তবে ইরানের বর্তমান প্রস্তাবে এই বিষয়টি আলোচনার সূচি থেকে সরিয়ে একেবারে শেষ ধাপে রাখা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের খনিজ তেলের চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ নিশ্চিত করে। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই জলপথটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইরানের নতুন এই প্রস্তাবে ওমানকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি একটি ইতিবাচক কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং এটি কেবলমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসাক্ষেত্রের গবেষণার জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের এই দাবি মেনে নিতে নারাজ। ওয়াশিংটন মনে করে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে চাইছে। এই দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে পারমাণবিক ইস্যুকে আলোচনার শেষে রাখার প্রস্তাবটি বাইডেন প্রশাসনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার স্বার্থে পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক এবং কাতার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমান প্রস্তাবটি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনার একটি সুযোগ হতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন। তবে ওয়াশিংটন পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রেখে শুধুমাত্র নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক জলপথ নিয়ে আলোচনায় বসতে রাজি হবে কি না, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং গালফ নিউজের সূত্র মতে, হোয়াইট হাউস এই প্রস্তাবটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। এখন দেখার বিষয়, এই প্রস্তাবটি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির অবসান ঘটায় নাকি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বিদ্যমান দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
তথ্যসূত্র: আরটি (RT), গালফ নিউজ, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং অ্যাক্সিওস।