খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 27শে ভাদ্র ১৪৩২ | ১১ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
রাজধানী ঢাকার বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র মতিঝিল। এর পরই আসে গুলশান ও তেজগাঁওয়ের নাম। গুলশান একদিকে যেমন ব্যবসায়িক কেন্দ্র, তেমনি এখানে বসবাস করে দেশের ধনী শ্রেণির বড় অংশ। সম্প্রতি এ সব বাণিজ্যিক ও অভিজাত এলাকা তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপত্তাহীন হয়ে উঠেছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যমতে, গত ছয় মাসে (ফেব্রুয়ারি-জুলাই) ঢাকায় সংঘটিত দাঙ্গার প্রায় তিন-চতুর্থাংশই হয়েছে মতিঝিল, গুলশান ও তেজগাঁও বিভাগে। অপরাধ হিসেবে ‘মব সহিংসতা’কেই ‘দাঙ্গা’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।
মতিঝিল ব্যাংক পাড়া হিসেবে পরিচিত। এখানে প্রায়ই দাবি-দাওয়া কেন্দ্রিক আন্দোলন, অবরোধ ও ঘেরাও কর্মসূচি পালিত হয়। এমনকি থানার ভেতরেও মব তৈরির ঘটনা ঘটেছে। গত ২৯ জুলাই ৩০–৩৫ জনের একটি মব মতিঝিলের একটি বাণিজ্যিক ভবন দখলের চেষ্টা করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে মবকারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে থানায় হামলার চেষ্টা চালায়। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়।
মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘এখানে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই বাণিজ্যিক। কর্মীরা মাঝে মাঝে দাবি-দাওয়া নিয়ে কর্মসূচি পালন করেন। উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়।”
শুধু মতিঝিল নয়, গুলশানেও গত ছয় মাসে কয়েকটি মবের ঘটনা ঘটেছে। ৫ মার্চ গুলশান-২ নম্বরের ৮১ নম্বর সড়কের একটি বাসা ঘেরাও করে মব গঠিত হয়। নেতৃত্ব দেন ওই বাসার সাবেক তত্ত্বাবধায়ক শাকিল আহমেদ। তিনি গুজব ছড়িয়ে দেন যে বাসাটিতে ২০০–৩০০ কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে। এতে জনতা বেআইনিভাবে তল্লাশিতে নেমে পড়ে। বাসাটি সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সাংসদ তানভীর ইমামের সাবেক স্ত্রীর। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং তিনজনকে গ্রেপ্তার করে।
এর আগে গত ২৭ জুন রাতে বারিধারা কূটনৈতিক জোনের একটি বাড়িতে মব হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ওই ভবনের দুটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন ক্যাপিটাল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের এমডি মোকাররম হোসেইন খান ও তার মেয়ে মাহিরা হোসেইন খান। অভিযোগ ওঠে, মব তাদের ফ্ল্যাট দখলের চেষ্টা চালায়।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলেও একই ধরণের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এসব এলাকায় সংঘটিত অপরাধে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “মতিঝিল, গুলশান ও তেজগাঁওয়ের মতো বাণিজ্যিক এলাকায় মবের ঘটনা ব্যবসায়িক আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ সব ধরনের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ভোক্তারাও ঝুঁকিতে পড়ছেন। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হচ্ছে এবং কর্মসংস্থান তৈরির পথে বড় বাধা তৈরি হচ্ছে।”
ডিএমপি তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে রাজধানীতে ৩৮টি দাঙ্গার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৩টি মতিঝিলে, ৮টি গুলশানে এবং ৭টি তেজগাঁওয়ে ঘটেছে। এ সময় ২৩১টি দস্যুতার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়, যার বড় অংশ তেজগাঁওয়ে। এছাড়া একই সময়ে রাজধানীতে ৫০৩টি জখমের ঘটনা ঘটেছে, এর মধ্যে মতিঝিলেই ১২৯টি।
ডিএমপির মিডিয়া ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, “রাজধানীর অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। মব প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি কৌশলগত স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।’
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাঙ্গা ও মব প্রায় একই ধরনের অপরাধ। তবে ‘মব’ শব্দটি সাম্প্রতিক এবং এর মাধ্যমে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বোঝানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “আমাদের পেনাল কোডে সরাসরি মব রিলেটেড কোনো আইন নেই। সব আইন ১৮৯৮ সালের ধাঁচে দাঙ্গা কেন্দ্রিক। সময়ের পরিবর্তনে মবকেও অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, ‘বাণিজ্যিক এলাকায় মবকারীদের দাপট চলতে থাকলে বিনিয়োগ ও উদ্যোগ সংকুচিত হবে। ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন। এর প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। তাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শক্ত হাতে এগুলো দমন করতে হবে।”
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান মনে করেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিনিয়োগের অনুকূলে নেই। “বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার চান। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তাদের আস্থা দিচ্ছে না,’ বলেন তিনি।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “গত বছরের ৫ আগস্টের পর মব তৈরির প্রবণতা অনেক কমেছে। তবে মতিঝিল-গুলশানের মতো এলাকায় অর্থনৈতিক স্বার্থে এখনো মব তৈরি হচ্ছে। পুলিশকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু পুলিশ নয়, সমাজের সবার সহযোগিতা দরকার।”
খবরওয়ালা/এমএজেড