খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ২৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
দেশব্যাপী মশার উপদ্রব এখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সকাল থেকে রাত, ঘর-বাড়ি, দোকান-রাস্তা—প্রায় সর্বত্রই মানুষকে কামড়াচ্ছে মশা। রাজধানীর মহাখালী আমতলী কাঁচাবাজারের দোকানি ইসমাইল হোসেন বলেন, “সকালে দোকান খোলা থেকে রাত পর্যন্ত মনে হয় হাজারো মশা কামড় দিয়েছে। পায়ে মোজা পরেও হাত-মুখে লাল দাগ। কয়েল বা ইলেকট্রিক ব্যাট কোনো কাজে আসছে না। দোকানে মশারি টাঙানো সম্ভব নয়।”
শহর ও উপজেলার খাল-বিল-ডোবায় কিউলেক্স মশার বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। এডিস ও কিউলেক্স মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও অন্যান্য রোগ নীরবে মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। মশক নিধনে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন।
গতকাল স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল এবং প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত সরেজমিনে মশক নিধন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সায়েদাবাদ এলাকায় তারা মশার ওষুধের গুণগত মান যাচাই করেন। মন্ত্রী জানান, “কিউলেক্স মশা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। এখন থেকে ওষুধ ছিটানোতে দ্রুত কার্যক্রম শুরু হবে। খাল-নালা ও ডোবা পরিষ্কার করা হবে এবং স্পিডবোট ব্যবহার করে জলাভূমিতে লার্ভা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। জনগণের সহযোগিতা জরুরি।”
ডিএনসিসির মশক নিধন ওষুধ সংরক্ষণাগার পরিদর্শন করেন প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত। উভয় মন্ত্রী এ বিষয়ে নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করেছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, “মশার প্রকোপ প্রতিদিন বাড়ছে। কিউলেক্স মশার বংশবিস্তার রোধ করতে ড্রেন, খাল ও ডোবা পরিষ্কার করে লার্ভিসাইড প্রয়োগ জরুরি। এডিস এবং কিউলেক্স মশার নিয়ন্ত্রণ আলাদা, তাই সমন্বিত বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।” তিনি ঢাকার তিনটি প্রধান এডিস প্রজনন স্থানের তথ্য দিয়েছেন।
| স্থান | লার্ভা অনুপাত (%) | বিবরণ |
|---|---|---|
| নির্মাণাধীন ভবনের মেঝে | ৪৭ | জমে থাকা পানি ও নির্মাণ সামগ্রীতে |
| বাড়ির নিচতলা | ১৭ | পানি জমে থাকা স্থল ও পাত্রে |
| প্লাস্টিকের ড্রাম | ১৫ | জমে থাকা পানি ও আবর্জনায় |
রাজবাড়ী: ড্রেন বন্ধ, আবর্জনা স্তূপে মশার উৎপাদন বৃদ্ধি। ডেঙ্গু পরীক্ষা বাড়ছে।
পটুয়াখালী: পৌর এলাকার ৩, ৪ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড ঝুঁকিতে। সবুজবাগে বিগত বছরে অন্তত ৫ জন মারা গেছেন।
ময়মনসিংহ: আবর্জনা ও জলাবদ্ধতা মশার বৃদ্ধি মূল কারণ। শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি ঝুঁকিতে।
বাগেরহাট: ১২৫ বর্গকিমি এলাকায় ৮৮ কিমি ড্রেন ননপরিষ্কার। ২৫৬ জন ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত, মৃত্যু ৫।
কুড়িগ্রাম: সদর, নাগেশ্বরী ও উলিপুর পৌরসভায় মশার বিস্তার বেড়েছে।
রংপুর: ১০ হাজার লিটার ওষুধ, ৮০টি ফগার, ৬৬টি হ্যান্ড স্প্রে মেশিন দিয়ে দ্রুত অভিযান।
রাজশাহী: মশার উৎপাত বেড়ে শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সিটি করপোরেশন কার্যক্রম শুরু করেছে।
নারায়ণগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জ: রাতের পর খোলা জায়গায় দাঁড়ানো দুঃসাধ্য। বর্ষায় ঝুঁকি বাড়বে।
মেহেরপুর: চলতি পথেও মশার রাজত্ব। ডেঙ্গু আতঙ্ক বাড়ছে।
মুন্সিগঞ্জ: শহর-গ্রাম সর্বত্র মশার উপদ্রব। ড্রেনেজ ব্যর্থতা প্রধান কারণ।
নীলফামারী: পৌর এলাকায় মশার উপদ্রব ভয়াবহ। মশক নিধন কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না।
বগুড়া: দুই সপ্তাহে মশার উৎপাত বেড়ে গেছে। বাড়িতে কয়েল, ব্যাট কাজ করছে না।
হবিগঞ্জ: পৌর এলাকার নালা ও আবর্জনায় মশার উৎপাত বৃদ্ধি।
গাজীপুর: কিউলেক্স মশার উপদ্রব মারাত্মক, সিটি করপোরেশন তৎপর।
দিনাজপুর: দিনের বেলায়ও মশার কামড়। ড্রেন-নর্দমা জীবাণুনাশক প্রয়োগ না হওয়ায় পরিস্থিতি খারাপ।
চট্টগ্রাম: নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হলেও কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে।
নড়াইল: দিনে কম, রাতে বেশি। কোয়েল ও মশারি ব্যবহার করছেন মানুষ।
সিলেট: দিনরাত সমানভাবে কামড়। সদ্য প্রশাসক দায়িত্ব নিয়ে কার্যক্রম শুরু।
মশার বিস্তার রোধে কার্যকর ও পরিকল্পিত মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জরুরি। বিশেষ করে খাল-নালা পরিষ্কার রাখা, জলাবদ্ধতা দূর করা, লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। বর্ষাকালে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, তাই এখন থেকেই প্রাথমিক পদক্ষেপ নেওয়া অত্যাবশ্যক।
মশার কামড়ে সাধারণ মানুষ দিনরাত অতিষ্ঠ হলেও সরকারের তৎপরতা, বিজ্ঞানভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সচেতনতা মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তবে তা হবে সমন্বিত ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে।
এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত জেলার তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, দেশব্যাপী মশার বিস্তার অত্যন্ত গুরুতর অবস্থায় পৌঁছেছে এবং তা শুধুমাত্র এককভাবে জেলা প্রশাসন বা সিটি করপোরেশনের তৎপরতায় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।