খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে বিএনপি জোটের জয়জয়কার থাকলেও ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেছে যশোরে। জেলাটির ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই বিএনপির প্রার্থীদের নজিরবিহীন পরাজয় ঘটেছে। কেবল একটি আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থী। বিপরীতে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের এই অভাবনীয় ও নিরঙ্কুশ বিজয় জেলার রাজনৈতিক সমীকরণকে ওলটপালট করে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় সূত্রগুলো বিএনপির এই ভূমিধস পরাজয়ের পেছনে তিনটি সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী কারণ চিহ্নিত করেছেন।
যশোরের নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সাংগঠনিক অদূরদর্শিতাই দলটির জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১. মনোনয়ন নিয়ে হঠকারী সিদ্ধান্ত: যশোর-১, যশোর-৬ সহ বেশ কিছু আসনে জনপ্রিয় ও প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন করে নতুন মুখ আনা হয়। এই হঠকারী সিদ্ধান্তে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমী নেতা ও কর্মীরা ক্ষুব্ধ হন, যার প্রতিফলন ঘটেছে ব্যালটে।
২. মনোনয়নবঞ্চিতদের অসহযোগিতা: প্রায় প্রতিটি আসনেই যারা দলের মনোনয়ন পাননি, তারা বিজয়ী প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামেননি। অনেক ক্ষেত্রে তাদের অনুসারীরা ক্ষোভ থেকে জামায়াতের প্রার্থীদের পক্ষে গোপনে বা প্রকাশ্যে কাজ করেছেন।
৩. নারী ভোটার ও ধর্মীয় প্রচারণার প্রভাব: নির্বাচনী মাঠে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে পরিচালিত সুসংগঠিত ধর্মীয় প্রচারণার বিপরীতে বিএনপি কোনো কার্যকর রাজনৈতিক বা বিকল্প বয়ান দাঁড় করাতে পারেনি। ফলে নারী ভোটারদের বড় একটি অংশ জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
নিচে যশোরের ছয়টি আসনের নির্বাচনী ফলাফলের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| আসন | বিজয়ী প্রার্থী (দল) | প্রাপ্ত ভোট | নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী (দল) | প্রাপ্ত ভোট | ব্যবধান |
| যশোর-১ | মোহাম্মদ আজীজুর রহমান (জামায়াত) | ১,১৯,০৯৩ | নুরুজ্জামান লিটন (বিএনপি) | ৯৩,৫৪২ | ২৫,৫৫১ |
| যশোর-২ | মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ (জামায়াত) | ১,৮০,৯৬৫ | সাবিরা সুলতানা (বিএনপি) | ১,৪৬,৬৪৭ | ৩৪,৩১৮ |
| যশোর-৩ | অনিন্দ্য ইসলাম অমিত (বিএনপি) | ২,০১,৩৩৯ | আব্দুল কাদের (জামায়াত) | ১,৮৭,৪৬৩ | ১৩,৮৭৬ |
| যশোর-৪ | মো. গোলাম রসুল (জামায়াত) | ১,৭৬,৯১২ | মতিয়ার রহমান ফরাজী (বিএনপি) | ১,৩১,৯১৭ | ৪৪,৯৯৫ |
| যশোর-৫ | গাজী এনামুল হক (জামায়াত) | ১,৩২,৮৭৬ | শহীদ মো. ইকবাল (স্বতন্ত্র/বিএনপি বিদ্রোহী) | ৮৫,০৪৫ | ৪৭,৮৩১ |
| যশোর-৬ | মো. মুক্তার আলী (জামায়াত) | ৯১,০১৮ | আবুল হোসেন আজাদ (বিএনপি) | ৭৯,৩২১ | ১১,৬৯৭ |
যশোর-১ ও যশোর-৬: এই দুটি আসনে মফিকুল হাসান ও কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণের মতো জনপ্রিয় নেতাদের শেষ মুহূর্তে সরিয়ে নুরুজ্জামান লিটন ও আবুল হোসেন আজাদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। শ্রাবণের পারিবারিক পরিচয় ও আওয়ামী লীগের ভোট টানার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাকে বাদ দেওয়া এবং মফিকুলের অনুসারীদের ক্ষোভের কারণে এই দুই আসনে ধানের শীষের পরাজয় নিশ্চিত হয়।
যশোর-৪ ও যশোর-৫: যশোর-৪ আসনে জনপ্রিয় প্রার্থী টি এস আইয়ুবের মনোনয়ন ঋণখেলাপির দায়ে বাতিল হলে বিএনপি সংকটে পড়ে। অন্যদিকে, যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে শহীদ ইকবাল হোসেনকে বাদ দিয়ে শরিক দল জমিয়তে ইসলামের প্রার্থী রশিদ আহমাদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে শহীদ ইকবাল দাঁড়িয়ে যাওয়ায় বিএনপির ভোট দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, যার সুফল পায় জামায়াত।
যশোর-৩ (সদর): এই আসনটিতে কোনো বড় অভ্যন্তরীণ কোন্দল না থাকায় এবং অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের ব্যক্তিগত ক্লিন ইমেজের কারণে জামায়াতকে পরাজিত করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখানেও জামায়াতের আব্দুল কাদের যে পরিমাণ ভোট পেয়েছেন, তা জেলা বিএনপির জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন পরাজয় মেনে নিয়ে জানিয়েছেন, কেন সারা দেশে জয়ের জোয়ার থাকা সত্ত্বেও যশোরে এমন বিপর্যয় ঘটল, তা গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা হবে। মূলত জামায়াতের সুশৃঙ্খল প্রচার এবং দলীয় কোন্দলই যশোরে বিএনপির দুর্গকে ধসিয়ে দিয়েছে।