খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
২০২৫ সাল বাংলাদেশের জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য এক চরম অস্থিরতার বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বছরজুড়ে সারা দেশে সহস্রাধিক হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্য দিবালোকে গোলাগুলি এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চরমভাবে ভেঙে পড়েছে। জমি সংক্রান্ত বিরোধ, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত শতাধিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অসংখ্য প্রাণহানি ঘটেছে। নড়বড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পুনরুত্থান এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ ব্যবহার জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
বছরের শেষ মাসগুলোতে অপরাধের মাত্রা ছিল আকাশচুম্বী। ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ভোলার ছাত্রদল নেতাকে কুপিয়ে হত্যা থেকে শুরু করে ১৮ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনাই ছিল রোমহর্ষক। হাদিকে ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকায় মাথায় গুলি করা হয়, যার কয়েক দিন পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। একই দিন ময়মনসিংহের ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস নামে এক পোশাক শ্রমিককে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করার মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতাও প্রত্যক্ষ করেছে দেশবাসী।
নিচে গত কয়েক মাসের অপরাধ ও সহিংসতার পরিসংখ্যান এবং উল্লেখযোগ্য ঘটনার একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
| ক্যাটাগরি / সময়কাল | ঘটনার বিবরণ ও নিহতের সংখ্যা | বিশেষ মন্তব্য |
|---|---|---|
| মোট খুনের মামলা | গত ১৫ মাসে ৪,৮০৯টি (চলতি বছরের ১০ মাসে ৩,২৩৬টি)। | পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী। |
| রাজনৈতিক সহিংসতা | জানুয়ারি-নভেম্বরে অন্তত ১২০ জন নিহত। | এইচআরএসএস (HRSS)-এর রিপোর্ট। |
| নভেম্বরের চিত্র | ৯৬টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১২ জন নিহত, ৮৭৪ জন আহত। | সবচেয়ে সহিংস মাসগুলোর একটি। |
| অক্টোবরের চিত্র | ৬৪টি সহিংস ঘটনায় ১০ জন নিহত, ৫১৩ জন আহত। | রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি। |
| গ্রেপ্তার ও অভিযান | মাদক ও সাইবার অপরাধে প্রায় ১০ হাজার গ্রেপ্তার। | আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয়তা। |
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পুনরায় সক্রিয় হওয়া এবং দুর্বল পুলিশিং ব্যবস্থার কারণে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নভেম্বরে পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে দোকানের ভেতর গুলি করে হত্যা এবং পরবর্তীতে একজন নিরীহ রিকশাচালককে গুলি করার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এর আগে আদালত পাড়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে হত্যা এবং খুলনায় আদালত চত্বরে দুজনকে গুলি করে মারার ঘটনা রাষ্ট্রের বিচারিক এলাকায় নিরাপত্তার দৈন্যদশাকেই ফুটিয়ে তোলে।
যদিও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জোর দিয়ে বলেছেন যে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের আগে পরিস্থিতির অবনতি হবে না, তবুও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যতক্ষণ পর্যন্ত অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেতাদের নেটওয়ার্ক ছিন্ন করা না যাবে, ততক্ষণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।