খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 12শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৫ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মানুষ নন, তিনি এক মহামানব, ড. মজিবর রহমান দেবদাস
কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের জীবনের গল্প ইতিহাসের বইয়ে যতটা লেখা হয়, তার চেয়েও অনেক বেশি লেখা থাকে আমাদের বিবেকের ভেতর।
ড. মজিবর রহমান দেবদাস তেমনই এক নাম—একটি উচ্চারণ, যা শুধু একজন মানুষকে নয়, এক অনমনীয় চেতনা, এক অদম্য মানবিক সাহসকে ধারণ করে।
নামটি শুনলেই একটু থমকে যেতে হয়— মজিবর রহমান, আবার শেষে দেবদাস!
এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক প্রতিবাদ, এক ইতিহাস, এক অসামান্য অবস্থান।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের এই প্রখ্যাত শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ১৯৬৪ সালে মেলবোর্নে ফলিত গণিতে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগ দেন—একজন প্রতিশ্রুতিশীল শিক্ষাবিদ হিসেবে তাঁর পথচলা তখনই দৃঢ় ভিত্তি পায়।
কিন্তু ১৯৭১—এই ভূখণ্ডের ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা যখন পূর্ববাংলার মানুষের উপর নেমে আসে, বিশেষ করে হিন্দু সংখ্যালঘুরা যখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় বাধ্য হয়ে নাম-পরিচয় বদলাতে থাকেন, তখন তিনি উল্টো পথ বেছে নেন।
প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে তিনি নিজের নামই বদলে ফেললেন—
মজিবর রহমান থেকে হয়ে গেলেন দেবদাস।
এটি ছিল শুধু একটি নাম পরিবর্তন নয়—এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অসাধারণ, নিঃশব্দ কিন্তু তীব্র প্রতিবাদ।
১৯৭১ সালের ১০ মে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের প্যাডে লেখা এক সংক্ষিপ্ত ঘোষণায় তিনি জানান—
এই বিশ্ববিদ্যালয় আর শিক্ষালয় নয়, এটি সেনাশিবিরে পরিণত হয়েছে।
জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি আর এখানে ফিরবেন না।
মাত্র কয়েকটি বাক্য—কিন্তু সেই শব্দগুলোয় ছিল এক শিক্ষকের অমিত সাহস, এক মুক্তচিন্তার দীপ্ত ঘোষণা।
এরপরই নেমে আসে ভয়াবহ পরিণতি। পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। টানা প্রায় পাঁচ মাস তাঁকে টর্চার সেলে বন্দি রেখে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।
শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন, মানসিকভাবেও গভীর আঘাত পান।
লেখক নাজিম মাহমুদের ভাষায়—তিনি যেন “জ্যান্ত শহীদ”।
স্বাধীনতার পরও তাঁর লড়াই থেমে থাকেনি—বরং অন্য এক রূপ নেয়।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যেতে চাইলে, তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কারণ—তিনি আর “মজিবর রহমান” নন, তিনি “দেবদাস”!
যে দেশে স্বাধীনতার জন্য তিনি এত বড় মূল্য দিলেন, সেই দেশেই তাঁর অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হলো।
তাঁকে বলা হলো—নাম বদলে ফিরে আসতে।
কিন্তু তিনি আপস করেননি।
বরং এফিডেভিট করে স্থায়ীভাবে নিজের নাম “দেবদাস” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
এরপর তিনি ফিরে যান গ্রামে—জয়পুরহাটে।
নিঃশব্দ, অবহেলিত এক দীর্ঘ জীবন কাটান।
বিশ্বে জন ন্যাশ মানসিক অসুস্থতার মধ্যেও গেম থিওরিতে অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার অর্জন করে বিশ্বজুড়ে সম্মানিত হন।
কিন্তু আমাদের এই ভূখণ্ডের “দেবদাস”—আমাদেরই এক জন ন্যাশ—অবহেলা আর বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যান।
অবশেষে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে—যেন অনেক দেরিতে আসা একটি প্রাপ্য স্বীকৃতি।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—
আমরা কি তাঁকে সত্যিই স্মরণ করেছি?
নাকি তাঁকে একা ফেলে দিয়েছি ইতিহাসের প্রান্তে?
এই দেশ এমনি এমনি আসেনি।
এই স্বাধীনতার পেছনে রয়েছে অসংখ্য অজানা, অবহেলিত, ত্যাগী মানুষের গল্প।
ড. মজিবর রহমান দেবদাস তাঁদেরই একজন—বরং তাঁদের মধ্যেও অনন্য।
তাঁর পবিত্র পায়ে শ্রদ্ধা—
তাঁর সাহসের প্রতি স্যালুট—
আর তাঁর প্রতি আমাদের চিরন্তন ঋণস্বীকার।