আফতাব তাজ
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ফুটবলের ইতিহাসে যাঁরা সর্বকালের সেরা তাঁদের মধ্যে প্রশ্নাতীতভাবে লিওনেল মেসি শীর্ষে। দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার যেন রূপকথার মতো। কিশোর বয়সে বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশ, দীর্ঘ এক যুগ বিশ্বকাপ শিরোপার আক্ষেপ, অবশেষে কান্নায় ভাসা স্বপ্নপূরণ। সত্যিই মেসির পথচলা আর্জেন্টিনা নামক ফুটবল-দেবতার অমর কাব্য। এখন, শেষ প্রান্তটা একেবারেই কাছাকাছি। ২০২৬ বিশ্বকাপ (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে আয়োজিত) হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর শেষ অধ্যায়। জাদুকর এই ফুটবলারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে জাদুকরী দশটি মুহূর্তকে খবরওয়ালা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:
১০. স্বপ্নের অভিষেক (২০০৬)
জার্মানির মাঠে নামলেন মাত্র ১৯ বছর বয়সী এক কিশোর। সার্বিয়া–মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে তিনি খেললেন মাত্র ১৬ মিনিটের ক্যামিও, কিন্তু সেই সময়েই এক গোল করলেন এবং আরেকটি তৈরি করলেন। গ্যালারিতে বসা দিয়েগো ম্যারাডোনা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ও শুধু ভালো না, ও অসাধারণ!’

৯. দুর্দান্ত গ্রুপপর্ব, ২০১৪ বিশ্বকাপ
দক্ষিণ আফ্রিকায় গোলহীন থাকার আক্ষেপ নিয়ে ব্রাজিলের মাঠে নেমেছিলেন মেসি। খেলার শুরুতেই বসনিয়ার বিপক্ষে জাদুকরী এক গোল। পরের ম্যাচে ইরানের বুকে আঘাত হানা যোগ করা সময়ে দারুণ শট। আর নাইজেরিয়ার বিপক্ষে দুটি গোলের মধ্যে একটি শৈল্পিক জাদুকরি ফ্রি–কিক। যদিও আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত হেরেছিল, কিন্তু মেসির আলো নিভেনি।

৮. হাজারতম ম্যাচ (২০২২, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে)
পেশাদার ক্যারিয়ারের ১০০০তম ম্যাচে মেসির জন্য আলাদা কোনো আয়োজনের দরকার ছিল না—তিনি উদযাপন করলেন তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই। বক্সের ভেতর বল পেয়ে নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে সূক্ষ্ম এক ফিনিশ, আর তাতেই গোলের উৎসব। প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়ার মিডফিল্ডার কিনা বাকুস হতভম্ব হয়ে বলেছিলেন, ‘ও যেন মোমের মূর্তি, এতটাই অবাস্তব!’

৭. ব্রাজিলকে উড়িয়ে দেওয়া (২০১২, ইস্ট রাদারফোর্ড)
বন্ধুত্বপূর্ণ ম্যাচ হলেও প্রতিপক্ষ যখন ব্রাজিল, তখন তা আর্জেন্টিনার জন্য সবসময়ই সম্মানের লড়াই। আর সেই রাতেই মেসি দেখালেন তাঁর জাদুকরী রূপ। হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে ম্যাচকে নিজের কবজায় নিলেন তিনি। বিশেষ করে তৃতীয় গোলটি, মধ্যমাঠ থেকে অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটে গিয়ে টপ কর্নারে ঝলসে ওঠা বজ্রগতির শট ছিল একেবারেই অপ্রতিরোধ্য। খেলা শেষে কোচ আলেহান্দ্রো সাবেয়া হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘আমাদের সৌভাগ্য যে লিও আর্জেন্টিনার।’

৬. গভার্ডিওলকে ঘোরের মধ্যে ফেলা (২০২২, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে)
তরুণ ক্রোয়াট ডিফেন্ডার জোস্কো গভার্ডিওল সেই সময় ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর নজর কাড়ছিলেন, সবাই মুগ্ধ হচ্ছিল তাঁর রক্ষণভাগের দৃঢ়তায়। কিন্তু কাতারের আলো ঝলমলে রাতে লুসাইল স্টেডিয়ামে তিনি হয়ে গেলেন কেবল দর্শক। মেসি একের পর এক টার্নে তাঁকে ঘুরিয়ে অসহায় করে দিলেন, যেন অভিজ্ঞতার পাঠ শেখাচ্ছেন প্রতিভাবান ছাত্রকে। শেষ পর্যন্ত নিখুঁত কাটব্যাক পাসে জুলিয়ান আলভারেজকে উপহার দিলেন গোল, যেটি বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় অ্যাসিস্ট হয়ে আছে। খেলা শেষে গভার্ডিওল হেসে হেসে বলেছিলেন ‘আমি অন্তত বলতে পারব মেসিকে ৯০ মিনিট মার্ক করেছি।

৫. ‘লুসাইলের যুদ্ধ’ (২০২২, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে)
মেসির সেই জাদুকরী পাস, যা কল্পনাতেও ধরা দিচ্ছিল না কারও চোখে, নাহুয়েল মোলিনার জন্য তৈরি করল এক মহাকাব্যিক মুহূর্ত। বিশ্বকাপ ইতিহাসে স্থান পাওয়া সেই অ্যাসিস্ট যেন ছিল ক্যানভাসে আঁকা এক শিল্পকর্ম। কিন্তু ওই ম্যাচের পর আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মনে আরও গভীর ছাপ ফেলেছিল অন্য এক দৃশ্য। সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে মেসি মুখোমুখি হলেন ডাচ স্ট্রাইকার ভেগহর্স্টের। ঠোঁটে উঠে এলো ঝলসে ওঠা বাক্য— ‘কি দেখছিস, বোকার মতো?’ সেদিন প্রথমবার আর্জেন্টিনা দেখল ভিন্ন রূপের মেসিকে, শান্ত, বিনয়ী জাদুকরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আগুনঝরা যোদ্ধাকে। খোঁজে পেলো নেতৃত্বের জেদি চরিত্রে তিনিও ম্যারাডোনার যোগ্য উত্তরসূরি।

৪. মেক্সিকোর বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো (২০২২ বিশ্বকাপ)
সৌদি আরবের কাছে অপ্রত্যাশিত হারের পর আর্জেন্টিনার চারপাশে নেমে এসেছিল ঘন অন্ধকার। টানা ৩৬ ম্যাচের অপরাজেয়তার রেকর্ড ভেঙে ভেঙে পড়েছিল আত্মবিশ্বাস, চারদিকে উঠেছিল বিদায়ঘণ্টার শঙ্কা। মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচটিও যাচ্ছিল উত্তেজনার কিনারায়—হতাশ দর্শক, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা মুহূর্ত। আর ঠিক তখনই, ৬৪ মিনিটে পা বাড়ালেন লিওনেল মেসি। দূরপাল্লার নিখুঁত শট ছুটে গেল জালের গভীরে। নীরব হয়ে যাওয়া গ্যালারি মুহূর্তেই ফেটে পড়ল উল্লাসে। ম্যাচ শেষে তিনি বলেছিলেন, ‘আজ থেকে আমাদের বিশ্বকাপ শুরু।’ ইতিহাস সাক্ষী, সেই কথাটাই হয়ে উঠেছিল বাস্তব। লুসাইল থেকে শুরু হওয়া সেই পুনর্জন্মই শেষ পর্যন্ত মেসিকে পৌঁছে দিয়েছিল ফুটবল ইতিহাসের শীর্ষ মঞ্চে।

৩. ঈশ্বরের উপহার (২০১৭, ইকুয়েডরের মাঠে)
টানা তিন ফাইনাল হারার পর ভেঙে পড়েছিলেন মেসি। ২০১৬ কোপা আমেরিকার পর কান্নায় ভেসে আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে যেন আর্জেন্টিনার স্বপ্নও শেষ করে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্য তাকে ছাড়েনি। ২০১৮ বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ার জন্য যখন আর্জেন্টিনা হন্যে হয়ে ঘুরছে, ঠিক তখনই ফিরে এলেন মেসি। কুইটোতে ইকুয়েডরের আতঙ্কিত দর্শক, পাহাড়ি উচ্চতার শ্বাসরুদ্ধ পরিবেশ—সব চাপ সামলে একাই করে ফেললেন হ্যাটট্রিক। আর্জেন্টিনাকে নিয়ে গেলেন বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করার সোনালী গন্তব্যে। সেদিন দেশবাসীর চোখে তিনি আর কেবল এক ফুটবলার ছিলেন না। তৎকালীন প্রেসিডেন্টের মুখে উচ্চারিত হলো ‘তিনি ঈশ্বরের উপহার।’

২. সেই জয় যা সবকিছু বদলে দিল (কোপা আমেরিকা ২০২১)
ম্যারাকানার পবিত্র মাঠে ব্রাজিলকে হারিয়ে শেষ হলো আর্জেন্টিনার দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপার খরা। ফাইনালে মেসি গোল পেলেন না, তবু পুরো টুর্নামেন্টে তিনি ছিলেন এক মহীরুহ—গোল্ডেন বল ও গোল্ডেন বুট দুই–ই তাঁর হাতে। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি, চোখের জলে ভেসে গেলেন আনন্দে। সেই মুহূর্তে আর্জেন্টিনার সারা দেশ তার সঙ্গে কাঁদল, খুশিতে ভেসে উঠল। পরে মেসি বলেছিলেন, ‘এটা যেন স্বপ্নের মতো ছিল।’

১. নিয়তি পূরণ (২০২২ বিশ্বকাপ, কাতার)
এটি শুধু ফুটবল নয়, এ মানব ইতিহাসের এক মহাকাব্য। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে দুই গোল করলেন মেসি, এবং পুরো নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচে নির্বাচিত হলেন ম্যাচসেরা। মন্টিয়েলের পেনাল্টি জালে গেলে মেসির চোখে ভেসে উঠল আনন্দের অশ্রু, এক জীবনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলো। তাঁর এই অসাধারণ সাফল্যের মাধ্যমে মেসি হয়ে গেলেন ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় যিনি দুবার বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল জিতেছেন, এবং সেইসাথে পেলেকে ছাড়িয়ে দিলেন বিশ্বকাপ গোল-অবদান তালিকায়। বয়স তখন ৩৫। গ্যারি লিনেকার লিখেছেন, ‘প্রায় দুই দশক মেসিকে দেখা ছিল বিশেষ এক সৌভাগ্য। তিনি ফুটবল দেবতার উপহার।’

লিওনেল মেসি শুধু ফুটবলার নন, তিনি আর্জেন্টিনার রক্তে মিশে থাকা এক কবিতা। কান্না, আনন্দ, হতাশা আর উল্লাসে তাঁর যাত্রা হয়ে উঠেছে এক চিরন্তন কিংবদন্তি। হয়তো আগামী বিশ্বকাপেই তিনি বিদায় নেবেন। কিন্তু আলবিসেলেস্তের নীল-সাদা জার্সিতে তাঁর প্রতিটি মুহূর্ত চিরকালীন স্মৃতি হয়ে থাকবে কোটি ভক্তের হৃদয়ে।
খবরওয়ালা/এমএজেড