খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 27শে ফাল্গুন ১৪৩১ | ১১ই মার্চ ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
দেশের অর্থনীতির সর্ববৃহৎ লুটপাটের খাত হচ্ছে পুঁজি বাজারের আইপিও (প্রাথমিক পাবলিক অফার)। এখাত থেকে গত ১৫ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পথে বসেছে লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারী। আর এসব সীমাহীন অনিয়ম দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকতা করেছে খোদ পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
২০০৯ সাল থেকে কোম্পানি তালিকাবদ্ধ করার ক্ষেত্রে ব্যপক অনিয়ম এবং দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে পুঁজিবাজারের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি । অসাধু সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শেয়ার কারসাজি, দুর্বল কোম্পানির আইপিও অনুমোদন, নিয়োগ জালিয়াতি, প্লেসমেন্ট শেয়ারের বাণিজ্য, কোম্পানি দখল এবং ট্রেক বাণিজ্য, প্রিমিয়ার শেয়ার ইস্যুসহ এমন কোনো অপরাধ নেই, যা করেনি এই কমিশন। এসব অপরাধের জন্য কমিশনের ভেতরের কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গেম্বলার, ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী আমলা, অডিট ফার্মসহ বিভিন্ন শ্রেণির পেশার মানুষ মিলে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলে।
বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় গতকাল সোমবার (১০ মার্চ) আবারও অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সিকিউরিটিজ কমিশন ভবনে বিএসইসির কার্যালয়ে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে এই অভিযান শুরু হয়। দুই সহকারী পরিচালকের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল এই অভিযান পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে।
দুদক জানিয়েছে, এসব অনুসন্ধানে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট জালিয়াতি ও বাণিজ্য, অধিক মূল্যে শেয়ার প্রাইস নিয়ে মার্কেটে প্রবেশ ও অল্প সময়ে শেয়ার বিক্রি, প্রাইসের দ্রুত অবনমনের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টিও পরিলক্ষিত হয়েছে।
দুদক আরও জানিয়েছে, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দল আরও দেখতে পায়, দুর্বল কোম্পানিগুলোকে অবৈধভাবে অনুমোদন দেয়ায় ক্যাপিটাল মার্কেটে প্রবেশের অল্পদিনেই তাদের লো পারফর্মিং কোম্পানি হিসেবে জেড ক্যাটেগরিভুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া জালিয়াতির মাধ্যমে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের প্রস্তুতকৃত উইন্ডো ড্রেসড ব্যালান্সশিট ও ফ্যাব্রিকেটেড আর্নিং রিপোর্ট ও ইস্যু ম্যানেজারের তৈরিকৃত ওভারভ্যালুড কোম্পানি প্রোফাইলের পরিপ্রেক্ষিতে অনিয়মের আশ্রয়ে বিএসইসি আইপিওর অনুমোদন দিয়েছে। প্রাপ্ত অনিয়মগুলোর বিষয়ে দুদক টিম প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে কমিশন বরাবর একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করবে।
জানা গেছে, দুদকের তদন্ত দল প্রথমে এসেই বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে বিএসইসির সার্ভিল্যান্স, মনিটরিং বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগে অভিযান পরিচালনা করেন।
এর আগে গত ২ মার্চ বিএসইসিতে অভিযান পরিচালনা করে দুদক। অভিযানকালে পাওয়া অনিয়মগুলো শিগগিরই কমিশন বরাবর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করবে বলেও জানায় দুদক। অভিযানকালে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম ২০১০ সাল-পরবর্তী দুই কমিশনের মেয়াদের অনিয়ম ও দুর্নীতির অনেক প্রমাণ পেয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন কোম্পানির প্রসপেক্টাসে থাকা আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যেও ম্যানিপুলেট করা হয়। আর্থিক অবস্থা দুর্বল থাকা কোম্পানিকে সবল দেখানো হয়। তারপর মার্কেটে ছাড়া হয় আইপিও। সেই কোম্পানি অব্যাহত প্রবৃদ্ধিও করেছে। তারপর একপর্যায়ে তাদের শেয়ারদর পড়তে শুরু করে। এতে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি হয়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে বিভিন্ন সময় এসব কোম্পানির বিষয়ে সতর্ক করে সুপারিশ করা হলেও বিএসইসি তা আমলে নেয়নি।
উল্লেখ্য, গত ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৮ আগস্ট। সরকার গঠনের পর ইউনূস সরকার বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিটি গঠন করেন। ২০০৯ থেকে গত ৫ আগস্ট পর্যন্ত অর্থনীতির ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি সম্পর্কে শ্বেতপত্র তৈরি করেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি।
শ্বেতপত্রের শেয়ার বাজার লুট অংশে বরা হয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে সরকারের সহযোগিতায় প্রতারণা, কারসাজি, প্লেসমেন্ট শেয়ার ও আইপিওতে জালিয়াতির মাধ্যমে শেয়ার বাজার থেকে ১ লাখ কোটি বা ১ ট্রিলিয়ন টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রভাবশালী উদ্যোক্তা গোষ্ঠী, ইস্যু ম্যানেজার, নিরীক্ষক ও বিনিয়োগকারীদের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মাধ্যমে কারসাজির একটি বড় নেটওয়অর্ক গড়ে ওঠে। বাজারের মধ্যস্থতাকারী দেউলিয়া হয়েছে, তাদের ইক্যুইটি ৩০ হাজার কোটি টাকা নেতিবাচক। যারা ব্যাংক খাতের অপরাধী, তারা শেয়ার বাজারে আস্থা নষ্ট করার পেছনেও ছিল বলে শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
খবরওয়ালা/ এমএজেড