খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 2শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ১৫ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
লেবাননে চলমান সামরিক সংঘাত এবং এর ফলে সৃষ্ট চরম মানবিক সংকটে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে বৈরিতা অবসানের আহ্বান জানিয়েছে বিশ্বের ১০টি রাষ্ট্র। বুধবার (১৫ এপ্রিল, ২০২৬) প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানসহ সদস্য দেশগুলো লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছে। গত মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ও নজিরবিহীন বাস্তুচ্যুতির প্রেক্ষাপটে এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, জর্ডান, সিয়েরা লিওন, সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্য তাদের যৌথ বিবৃতিতে দক্ষিণ লেবাননে নিয়োজিত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের (UNIFIL) ওপর হামলার ঘটনায় কঠোর নিন্দা জানিয়েছে। বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানবিক সহায়তা কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এখন অপরিহার্য। বিশেষ করে গত মাসে ইন্দোনেশিয়ার তিন শান্তিরক্ষী নিহত হওয়ার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
জাতিসংঘের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শান্তিরক্ষীদের হতাহতের পেছনে উভয় পক্ষের দায়বদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে যে, একজন শান্তিরক্ষী ইসরায়েলি ট্যাংকের গোলার আঘাতে এবং অন্য দুজন হিজবুল্লাহর পেতে রাখা আইইডি (IED) বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন।
চলমান এই যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে গত ২ মার্চ, ২০২৬ তারিখে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে ইসরায়েল পাল্টা বিমান হামলা এবং পরবর্তী সময়ে স্থল অভিযান শুরু করে। লেবানন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, দেড় মাসেরও কম সময়ে এই অভিযানে নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়েছে। ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী, একই সময়ে হিজবুল্লাহর হামলায় তাদের ২ জন বেসামরিক নাগরিক এবং ১৩ জন সেনা নিহত হয়েছে।
নিচে লেবানন ও ইসরায়েল সংঘাতের বর্তমান পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | লেবানন (ক্ষয়ক্ষতি/উপাত্ত) | ইসরায়েল (ক্ষয়ক্ষতি/উপাত্ত) |
| নিহতের সংখ্যা | ২,০০০+ জন | ১৫ জন (১৩ সেনা, ২ বেসামরিক) |
| বাস্তুচ্যুত জনসংখ্যা | ১২ লক্ষাধিক | উল্লেখ নেই |
| অভিযানের ধরণ | বিমান হামলা ও স্থল অভিযান | ক্ষেপণাস্ত্র ও আইইডি হামলা |
| শান্তিরক্ষী হতাহত | ৩ জন (ইন্দোনেশীয়) | প্রযোজ্য নয় |
| মূল দাবি | অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি | হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ |
আন্তর্জাতিক এই জোটটি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে কার্যকর হওয়া দুই সপ্তাহের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তারা সতর্ক করেছে যে, আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য লেবানন অংশটিকেও এই চুক্তির আওতায় আনা আবশ্যক। ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, যেকোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে অবশ্যই লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
বিপরীতে, ইসরায়েল এখন পর্যন্ত লেবানন সীমান্তে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নাকচ করে আসছে। তেল আবিবের পক্ষ থেকে বৈরুতকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ ছাড়া সামরিক অভিযান বন্ধ করা সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি থাকলেও লেবানন সংকট নিরসনে কোনো সুনির্দিষ্ট ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ১০টি দেশের এই সম্মিলিত অবস্থান বিশ্ব সম্প্রদায়ের ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। দক্ষিণ লেবাননের এই অস্থিতিশীলতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং বেসামরিক নাগরিকদের জানমাল রক্ষার স্বার্থে লেবানন সীমান্তে একটি টেকসই ও স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান এখন সময়ের দাবি।