খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় বিএনপির মনোনয়ন ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্য সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। এতে নারীসহ অন্তত আটজন আহত হয়েছেন। শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে উপজেলার হোসেন্দী ইউনিয়নের জামালদী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এই সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়–উদ্বেগ তৈরি হয়।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, বিএনপি সম্প্রতি সারা দেশের ৩৬টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে। মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে দলীয় মনোনয়ন পান কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ সম্পাদক মো. কামরুজ্জামান রতন। এই মনোনয়নকে কেন্দ্র করেই মূলত দ্বন্দ্বের শুরু। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মহিউদ্দিন আহমেদ মনোনয়ন না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হন এবং তার সমর্থকদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে।
এমন প্রেক্ষাপটে দুই পক্ষের মধ্যে টানাপড়েন ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় স্তরে দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামো এবং গ্রুপিং দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ সৃষ্টি করে আসছিল, মনোনয়ন ঘোষণার পর সেই বিভাজন সরাসরি সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে।
ঘটনাস্থলের প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যে জানা যায়, শুক্রবার বিকেলে মহিউদ্দিন আহমেদের সমর্থকেরা সাহারা মার্কেট এলাকায় যুবদল নেতা আলী হোসেনের অফিসের সামনে মশাল মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। একই সময়ে অন্যপক্ষ—যুবদল নেতা মাসুম আহমেদ ও হোসেন্দী ইউনিয়ন বিএনপির নেতা মমিন মৃধার নেতৃত্বে থাকা রতন সমর্থকেরা সড়কের পাশে অবস্থান করছিলেন।
এই অবস্থায় দুই পক্ষ মুখোমুখি হলে কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই সংঘর্ষ শুরু হয়। এক পক্ষের অভিযোগ, তাদের ওপর আগে হামলা চালানো হয়। অন্য পক্ষ দাবি করে—বিপরীত দিক থেকে গুলি, ককটেল বিস্ফোরণ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের মাধ্যমেই সংঘর্ষের সূত্রপাত।
এই সংঘর্ষে আহত হন স্বাধীন (২৮), শিরিনা বেগম (৪৬), সাইদুল (২৫), দেলোয়ার (৪৯), মোস্তফা (৪৮), সুজন (২৩), আসিফ মীর (১৯) এবং নয়ন (২৬)। এদের মধ্যে স্বাধীন ও সাইদুলের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া সংঘর্ষে আলী হোসেনের গাড়ি, অফিস এবং আশপাশের বেশ কয়েকটি দোকানে ভাঙচুর হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।
আলী হোসেন অভিযোগ করে বলেছেন,
“আমরা শান্তিপূর্ণভাবে মশাল মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ তারা এসে হামলা চালিয়েছে। গাড়ি ভাঙচুর করেছে এবং অন্তত ৬–৭ জনকে আহত করেছে।”
অন্যদিকে মমিন মৃধা দাবি করেন,
“রতন ভাই মনোনয়ন পাওয়ায় মানুষ আনন্দ করছে। আমরা আনন্দ মিছিল করছিলাম। আলী হোসেনের অফিস থেকে গুলি ও ককটেল নিক্ষেপ করা হলে আমরা প্রতিরোধ করি।”
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মাসুদ ফারুক বলেন,
“এটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ নয়। রতন ভাইয়ের মনোনয়ন পাওয়ায় সাধারণ মানুষ আনন্দ প্রকাশ করছিল। আওয়ামী দোসররা তা সহ্য করতে না পেরে হামলা করে।”
সংঘর্ষের খবর পেয়ে গজারিয়া থানার ওসি আনোয়ার আলম আজাদসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বেও প্রশাসনিক দল ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়।
এই ঘটনা শুধু একটি সংঘর্ষ নয়; বরং বিএনপির স্থানীয় সংগঠনের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের অগোছালো পরিস্থিতি ও গ্রুপিংয়ের বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে—
দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ,
দীর্ঘদিন সংগঠনের কার্যক্রমে স্থবিরতা,
এবং কেন্দ্রীয়–স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে আস্থাহীনতা
এই সংঘাতের পেছনে দায়ী।
এটি স্পষ্ট করেছে, নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি কার্যত দুটি ভাগে বিভক্ত—একদিকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থনকারী গ্রুপ, অন্যদিকে দীর্ঘদিন স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় কিন্তু প্রত্যাশিত মনোনয়ন না পাওয়া নেতাদের অনুসারী গ্রুপ।
গজারিয়ার এই ঘটনা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক সংকটকে সামনে এনে দিয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে দলটির অভ্যন্তরীণ বিভাজন যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে রাজনৈতিক মাঠে তাদের অবস্থান দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি প্রবল। প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও এলাকায় এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে।