খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 9শে চৈত্র ১৪৩২ | ২৩ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কীর্তিনাশা নদীর তীরে অবস্থিত ভোজেশ্বর হাট শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে কবুতর বেচাকেনার জন্য প্রসিদ্ধ। নদীর তীর ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা হাটটিকে প্রতি শুক্র ও সোমবার দেশ-বিদেশের ক্রেতাদের জন্য আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহের দুই দিনে এখানে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার কবুতর বিক্রি হয়।
ভোজেশ্বর হাটে দেশি জাতের কবুতর ছাড়াও পাওয়া যায় গিরিবাজ, সিরাজী, রেসিং, হোমার, টিপলার ও ময়ূরপঙ্খি জাতের কবুতর। বয়স, আকৃতি ও জাতভেদের ওপর ভিত্তি করে এক জোড়া কবুতরের দাম ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
হাটের ঐতিহ্য বহু প্রজন্ম ধরে ধরে চলমান। ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় জমিদাররা নৌপথের সুবিধা ব্যবহার করে হাটের গোড়াপত্তন করেন। সময়ের সাথে সাথে এটি শরীয়তপুর ও মাদারীপুর অঞ্চলের বিখ্যাত বাজারে পরিণত হয়। কেবল কবুতর নয়, এ হাটে গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, কৃষিপণ্য, হাঁস-মুরগি, গরু–ছাগল, মাছসহ নানা সামগ্রীও বিক্রি হয়।
ভোজেশ্বর হাটের ইজারাদার নিক্সন খান বলেন, “হাটের প্রতিটি সপ্তাহের শুক্র ও সোমবার মানুষের ভিড় লেগে থাকে। তবে কবুতরের হাটটি বিশেষভাবে সবাইর নজর কাড়ে। এই দুই দিনে বিক্রির পরিমাণ সাধারণত ৩০–৪০ লাখ টাকা হয়।”
৪০ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যবসায়ী আবদুল মোতালেব, বালাখানা এলাকার বাসিন্দা, জানিয়েছেন, “আমি এই হাটে দীর্ঘদিন ধরে কবুতর বেচাকেনা করছি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কবুতর সংগ্রহ করে এখানে নিয়ে আসি, আবার বিক্রি করে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পাঠাই। এই ব্যবসা দিয়েই সংসার চালিয়েছি এবং সন্তানদের পড়ালেখা করিয়েছি।”
স্থানীয় অনেক শিক্ষার্থীও ভোজেশ্বর হাট থেকে কবুতর সংগ্রহ করে খামার তৈরি করেছেন। পড়ালেখার পাশাপাশি শখের বশে তারা কবুতর লালন-পালন করছেন। নড়িয়া উপজেলার দিনারা এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রওশন মাহমুদ বলেন, “প্রতি শুক্রবার হাটে আসি। খামারের জন্য নতুন কবুতর কিনি বা বিক্রি করি। ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে হাটে আসার অভিজ্ঞতা আমাকে শখ তৈরি করেছে।”
হাটের পাশেই রয়েছে কবুতরের খাদ্য, ওষুধ, খাঁচা ও অন্যান্য সরঞ্জামের দোকান। এই দোকানগুলো প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। খাদ্য বিক্রেতা সেলিম হাওলাদার বলেন, “হাটের দিন না আসা ক্রেতাদের জন্য আমরা বিভিন্ন প্রজাতির কবুতর রাখি। কেউ কবুতরের মাংস খেতে চান, কেউ শখের জন্য লালন-পালন করেন। সকল ধরনের ক্রেতার জন্য আমরা প্রস্তুত থাকি।”
হাটের কার্যক্রম এবং বিক্রির তথ্যকে সংক্ষেপে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| তথ্য | বিবরণ |
|---|---|
| হাটের নাম | ভোজেশ্বর হাট |
| অবস্থান | নড়িয়া, শরীয়তপুর, কীর্তিনাশা নদীর তীরে |
| হাট বসার দিন | প্রতি সপ্তাহে শুক্র ও সোমবার |
| বিক্রির পরিমাণ | ৩০–৪০ লাখ টাকা প্রতি সপ্তাহ |
| জনপ্রিয় কবুতর প্রজাতি | দেশি, গিরিবাজ, সিরাজী, রেসিং, হোমার, টিপলার, ময়ূরপঙ্খি |
| এক জোড়া দাম | ৫০০–৫,০০০ টাকা |
| দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী | আবদুল মোতালেব (৪০ বছর অভিজ্ঞতা) |
| শিক্ষার্থী ব্যবসায়ী | রওশন মাহমুদ (বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী) |
ভোজেশ্বর হাট শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নয়, বরং গ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধরে রাখার এক মহত্ত্বপূর্ণ অংশ। শত বছরের ইতিহাস, কবুতরের বৈচিত্র্য এবং ক্রেতা-বিক্রেতার জীবন্ত সমন্বয় হাটটিকে দেশের অন্যতম চেনাশোনা বাজারে পরিণত করেছে।