খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের নারী শিক্ষা প্রসার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ঐতিহ্যের অন্যতম সাক্ষী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মেহেরুননেসা চৌধুরী পরলোকগমন করেছেন। গত বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) রাজধানী ঢাকায় নিজ বাসভবনে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। আজ শুক্রবার বনানী কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিক্ষা অঙ্গনে এক অপূরণীয় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মেহেরুননেসা চৌধুরী ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ও দক্ষ প্রশাসক। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৬২ সালে বরিশাল মহিলা কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সেখানে অধ্যাপনা করার পাশাপাশি তিনি প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষের গুরুদায়িত্বও পালন করেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে তৎকালীন সময়ে বরিশালে নারী শিক্ষার ভিত মজবুত হয়।
পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন, যা তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত—অর্থাৎ মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি রোকেয়া হলের হাউস টিউটর হিসেবে ছাত্রীদের আগলে রেখেছেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন এবং পরবর্তীতে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত নবগঠিত শামসুন নাহার হলের প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।
নিচে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকগুলো তুলে ধরা হলো:
| সময়কাল | প্রতিষ্ঠান/সংস্থা | পদবী/ভূমিকা |
| ১৯৬২ – ১৯৬৬ | বরিশাল মহিলা কলেজ | শিক্ষক ও অধ্যক্ষ |
| ১৯৬৭ – ১৯৭১ | রোকেয়া হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় | হাউস টিউটর |
| ১৯৭২ | রোকেয়া হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় | প্রাধ্যক্ষ (Provost) |
| ১৯৭২ – ১৯৭৫ | শামসুন নাহার হল, ঢাবি | প্রাধ্যক্ষ (Provost) |
| ১৯৭৬ – ১৯৯৩ | ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (TSC), ঢাবি | স্টুডেন্ট কাউন্সিলর |
| পরবর্তী সময় | লালমাটিয়া কলেজ | চেয়ারপারসন ও বোর্ড অব ডিরেক্টরস |
মেহেরুননেসা চৌধুরী কেবল হলের প্রাধ্যক্ষ হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র টিএসসিতে দীর্ঘ ১৭ বছর স্টুডেন্ট কাউন্সিলর হিসেবে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে কাজ করেছেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি লালমাটিয়া কলেজের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বেসরকারি পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রাখেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত রুচি ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী একজন মানুষ।
ব্যক্তিগত জীবনে মেহেরুননেসা চৌধুরী ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য আমিনুল হকের সহধর্মিনী। তিনি অত্যন্ত সফল একজন জননী। তাঁর সন্তানদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা ও দীপ্ত টিভির সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফুয়াদ চৌধুরী। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় তিনি ভুগছিলেন, তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তাঁর আদর্শ ও শিক্ষার প্রতি অনুরাগী ছিলেন।
তাঁর মৃত্যুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। শোকবার্তায় বলা হয়েছে, মেহেরুননেসা চৌধুরীর মতো নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাবিদদের অবদান বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও নারী জাগরণের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় আজ বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।