খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 2শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ১৫ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং নৌ-বীমা খাতে দীর্ঘ তিন শতাব্দীর ব্রিটিশ আধিপত্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (ডিএফসি)-কে একটি বিশেষ নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এই নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি শক্তিশালী সরকার-সমর্থিত পুনর্বীমা (Re-insurance) সুবিধা গড়ে তোলা। এই উদ্যোগটি মূলত স্ট্রেইট অব হরমুজ এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা ও বীমা নিশ্চয়তা প্রদানে কাজ করবে।
দীর্ঘ সময় ধরে বৈশ্বিক মেরিন ও যুদ্ধঝুঁকি বীমা বাজারে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে যুক্তরাজ্যের লয়েডস অব লন্ডন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং সমুদ্রপথে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে বীমা প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন বা মিসাইল হামলার আশঙ্কায় লয়েডস তাদের কভারেজ সীমিত করায় আন্তর্জাতিক জাহাজ মালিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ২০ বিলিয়ন ডলারের তহবিলের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো:
বিদ্যমান বাজারদরের চেয়ে কম প্রিমিয়ামে বীমা সেবা নিশ্চিত করা।
জাহাজের বডি (Hul), পণ্য (Cargo) এবং রাজনৈতিক ঝুঁকির পূর্ণ কভারেজ প্রদান।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
প্রয়োজনে বাণিজ্যিক জাহাজকে যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর মাধ্যমে বিশেষ এসকর্ট বা সুরক্ষা প্রদান করা।
যুক্তরাষ্ট্র এই বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বীমা প্রতিষ্ঠান চাব্ব লিমিটেড (Chubb Limited) সহ আরও বেশ কিছু বীমা সংস্থার সাথে অংশীদারিত্বের পরিকল্পনা করছে। নিচে এই উদ্যোগের প্রধান দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
| মোট তহবিলের আকার | ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার |
| মূল বাস্তবায়নকারী সংস্থা | ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (ডিএফসি) |
| টার্গেট অঞ্চল | স্ট্রেইট অব হরমুজ, পারস্য উপসাগর এবং লোহিত সাগর |
| বীমার ধরন | যুদ্ধঝুঁকি (War Risk), জাহাজের কাঠামোগত ক্ষতি এবং কার্গো বীমা |
| অতিরিক্ত সুবিধা | মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তা ও এসকর্ট সুবিধা |
| প্রধান সহযোগী | চাব্ব লিমিটেড এবং অন্যান্য মার্কিন বাণিজ্যিক বীমা কোম্পানি |
লয়েডস অব লন্ডন ১৬৮০-এর দশক থেকে বৈশ্বিক শিপিং বীমায় কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় লয়েডস জানিয়েছে যে, তারা এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সহযোগিতার জন্য তাদের দরজা উন্মুক্ত। তবে প্রতিষ্ঠানটি জোরালোভাবে দাবি করেছে যে, তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক এবং সুসংগঠিত কাঠামোর কারণে যুদ্ধঝুঁকি বীমা বাজারে তাদের কেন্দ্রীয় অবস্থান এখনো প্রশ্নাতীত।
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পুনর্বীমা সুবিধা চালু হলে বৈশ্বিক বীমা বাজারের একাংশ লন্ডন থেকে সরে গিয়ে ওয়াশিংটন বা নিউ ইয়র্ক কেন্দ্রিক হতে পারে। বিশেষ করে যেসব জাহাজ মার্কিন পতাকাবাহী অথবা মার্কিন স্বার্থের সাথে সংশ্লিষ্ট, তারা এই স্বল্পমূল্যের বীমা সুবিধার দিকে আগ্রহী হবে।
তবে এই উদ্যোগের কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন, সরকারি তহবিলের ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদে এই বিশাল ঝুঁকি সামলানো এবং কভারেজের সীমাবদ্ধতা বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হতে পারে। তা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং প্রিমিয়ামের একটি বড় অংশ মার্কিন অর্থনীতির দিকে প্রবাহিত করার লক্ষ্যেই এই কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের এই উদ্যোগটি শিপিং বীমা বাজারের প্রচলিত মানদণ্ড পুনর্নির্ধারণ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।