খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
আজও তো এলো না সে, ফাগুনে শ্রাবণে যে ছিল এই মনে আলোর ছায়া হয়ে ছিল পাশে…
বাংলা আধুনিক গানের স্বর্ণযুগের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র, কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার সতীনাথ মুখোপাধ্যায়-এর জন্মবার্ষিকী আজ।
১৯২৩ সালের ৭ জুন উত্তর প্রদেশের লখনউ শহরে তাঁর জন্ম। পিতা তারকদাস মুখোপাধ্যায়ের চাকরিসূত্রে জন্ম লখনউতে হলেও শৈশবেই তিনি চলে আসেন চুঁচুড়া-য়। হুগলির সেই সাংস্কৃতিক পরিবেশেই তাঁর বেড়ে ওঠা, শিক্ষা এবং সংগীতজীবনের ভিত রচিত হয়।
সংগীত যেন তাঁর রক্তের সঙ্গেই মিশে ছিল। ঠাকুরদা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় বেহালা বাজাতেন, আর পিতা গান গাইতেন। পারিবারিক সেই সংগীতময় আবহে ছোটবেলা থেকেই তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হন। ধ্রুপদ, ধামার, টপ্পা এবং শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে নিজেকে গড়ে তোলেন এক অনন্য শিল্পী হিসেবে।
কলকাতায় উচ্চশিক্ষার জন্য এলেও শেষ পর্যন্ত বইয়ের পাঠের চেয়ে সংগীতের সাধনাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ চিন্ময় লাহিড়ী-এর কাছে তালিম নিয়ে তিনি সংগীতজগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেন। কর্মজীবনে অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের অফিস (এজি বেঙ্গল)-এ চাকরি করলেও তাঁর প্রকৃত পরিচয় হয়ে ওঠে সুর ও সংগীতের জগতে।
আধুনিক বাংলা গান, নজরুলসংগীত এবং বাংলা গজলে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের অবদান অনন্য। তাঁর কণ্ঠে ছিল এক অপূর্ব কোমলতা, আবেগ এবং মাধুর্য, যা শ্রোতার হৃদয় স্পর্শ করত সহজেই। তাঁর গাওয়া গানগুলো শুধু জনপ্রিয়ই নয়, বাংলা গানের ইতিহাসে চিরস্থায়ী সম্পদ হয়ে আছে।
তাঁর কালজয়ী গানের তালিকায় রয়েছে— “আজও তো এলো না সে”, “আকাশ এত মেঘলা”, “জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পারো”, “মরমিয়া তুমি চলে গেলে”, “পাষাণের বুকে লিখো না আমার নাম”, “ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলো না”, “জানি একদিন”, “তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি”, “কত না হাজার ফুল”, “হায় বরষা” প্রভৃতি অসংখ্য অমর সৃষ্টি।
ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন সংগীতের এক নিবেদিত প্রাণ মানুষ। ১৯৬৮ সালে তিনি প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী উৎপলা সেন-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বাংলা গানের জগতে এই শিল্পী-দম্পতি আজও এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আছেন।
১৯৯২ সালের ১৩ ডিসেম্বর তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু হলেও শিল্পের মৃত্যু হয় না। তাই তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সতীনাথ মুখোপাধ্যায় আজও বেঁচে আছেন তাঁর সুরে, তাঁর গানে, তাঁর অসংখ্য অনুরাগীর হৃদয়ে।
বাংলা সংগীতাকাশের এই ধ্রুবতারার জন্মদিনে জানাই গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা। তাঁর অমলিন কণ্ঠ যুগে যুগে বাঙালির হৃদয়ে অনুরণিত হোক—
“আজও তো এলো না সে…”
অতল শ্রদ্ধাঞ্জলি।