খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রদেশের ভ্যাঙ্কুভার শহরের প্রবাসী বাঙালি সমাজের উদ্যোগে উদযাপিত হলো বাংলা সাহিত্যের দুই মহান সারথী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের যৌথ জন্মজয়ন্তী উৎসব। গত ১৬ মে বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে স্থানীয় সারে আর্টস সেন্টারের স্টুডিও থিয়েটারে এই বিশেষ সাংস্কৃতিক মিলনমেলার আয়োজন করে ‘প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটি’। দুই কালজয়ী স্রষ্টার সাহিত্য ও সংগীতের অম্লান চেতনাকে ধারণ করে প্রবাসী বাঙালিদের মাঝে দেশীয় সংস্কৃতির সুবাস ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই উৎসবের মূল লক্ষ্য।
‘প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটি’ দীর্ঘ দুই দশক ধরে, অর্থাৎ ২০০৪ সাল থেকে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শকে ধারণ করে প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতি লালন করে আসছে। সংগঠনটি বিভিন্ন সময়ে কবিপক্ষ, বাংলা নববর্ষ, মঞ্চনাটক ও সংগীতসন্ধ্যার মতো নানা উৎসবের আয়োজন করে থাকে।
অনুষ্ঠানের সফল রূপায়ণে নিয়োজিত পরিচালনা পর্ষদ, মূল শিল্পী ও নেপথ্য কলাকুশলীদের সুনির্দিষ্ট বিবরণ নিচে সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| আয়োজনের প্রধান খাতসমূহ | সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নাম ও বিবরণ |
| বোর্ড অব ডাইরেক্টরস (পরিচালনা পর্ষদ) | অনন্যা শীলা শামসউদ্দিন, লুবনা আলম, তানিয়া ঘোষ, মিকণ দাস, শ্রীপর্ণা গুহঠাকুরতা, মাইকেল মিত্র ও শামীম হারুন। |
| সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সঞ্চালনা | শ্রীপর্ণা গুহঠাকুরতা |
| মূল সংগীত ও নৃত্যশিল্পী দল | সুশ্বেতা ব্যানার্জি, হ্যাপি দাস, সুদীপ মুখার্জি, অনন্যা শীলা, রঞ্জনা মুখার্জি, লুবনা আলম, তানিয়া ঘোষ ও মাইকেল মিত্র। |
| যন্ত্রসংগীত শিল্পী দল | শুভময় দাসগুপ্ত এবং তাপস বিশ্বাস (তবলা ও কাহন), জগজিৎ সোহার (কি-বোর্ড) এবং সৈকত দাস (গিটার)। |
| নেপথ্য কর্মী ও মঞ্চ ব্যবস্থাপনা | শামীম হারুন (মঞ্চসজ্জা), আশিক বারি (শব্দ ও আলো) এবং মিশেল মিত্র (গৃহস্থালি)। |
| স্বেচ্ছাসেবক ও আলোকচিত্রী | স্বেচ্ছাসেবক: তাহমিদুল বারি, ডমিনিক প্রান্ত, উইলিয়াম ব্যানার্জি; আলোকচিত্রী: অভিষেক কর্মকার ও ডেরেক বাড়ৈ। |
অনুষ্ঠানের প্রারম্ভিক পর্বে দুই বিশ্বকবির জীবনদর্শননির্ভর একটি সারগর্ভ আলোচনা উপস্থাপন করেন প্রাবন্ধিক বিপুল কামাল। এরপর দুই কবির প্রতিকৃতি সংবলিত সুসজ্জিত মঞ্চে সমবেত কণ্ঠে নজরুলগীতি ‘শুভ্র সমুজ্জ্বল’ পরিবেশনের মাধ্যমে মূল সাংস্কৃতিক পর্বের সূচনা হয়। এই গানে সমাজ থেকে অন্যায়, অসত্য ও বৈষম্য দূর করে সত্যের আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে দেওয়ার যে আহ্বান ছিল, তা পুরো অনুষ্ঠানজুড়েই প্রতিফলিত হয়।
উদ্বোধনী পর্বের পরপরই সুশ্বেতা তাঁর সুললিত কণ্ঠে পরিবেশন করেন রবীন্দ্রসংগীত ‘তোমার কাছে এ বর মাগি’। এর পরক্ষণেই সংগঠনের শিশু ও কিশোর শিল্পী দল নজরুলগীতি ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে’ গানের সাথে একটি চঞ্চল নৃত্য পরিবেশন করে বসন্তের শেষভাগের প্রকৃতির রূপ তুলে ধরে। ঋতু বন্দনার রেশ ধরে ঐশী ও নবমিতার যৌথ নৃত্যে ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’ ও ‘নীল অঞ্জন ঘন কুঞ্জ ছায়ায়’ গানের সাথে বর্ষার মায়াবী পরিবেশ ও বিরহী হৃদয়ের ব্যাকুলতা প্রকাশ পায়। কিশোর নীলভ ও মোহর রবীন্দ্রসংগীত ‘আলো আমার আলো’ গানের মাধ্যমে মানবাত্মাকে জাগিয়ে তোলার এক আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি করে।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় ভাগে একক ও দ্বৈত পরিবেশনায় সংগীত ও নৃত্যের এক অপূর্ব কোলাজ দেখা যায়। লুবনা আলম তাঁর পরিশীলিত গায়কিতে নজরুলগীতি ‘মধুর নূপুর বাজে’ পরিবেশন করেন। এরপর শম্পার চমৎকার কবিতাপাঠ অনুষ্ঠানের সাহিত্যিক মাত্রাকে সমৃদ্ধ করে। সুদীপ ও লালনার দ্বৈত কণ্ঠে ‘মঞ্জরী ও মঞ্জরী আমের মঞ্জরী’ এবং ‘আজি এ সন্ধ্যা’ গানে বসন্তের আমের মুকুলের সুবাস ও স্নিগ্ধ সন্ধ্যার আবহ ফুটে ওঠে। কিশোর শুভজিৎ ও মানন্যা ‘তোমার খোলা হাওয়া’ গানের মাধ্যমে সামাজিক বিধি-নিষেধের গণ্ডি পেরিয়ে এক অবাধ মুক্তির আবহ তৈরি করেন।
তানিয়া ও সৈকতের যৌথ কণ্ঠে নজরুলগীতি ‘দাঁড়ায়ে দুয়ারে’ গানটি প্রেমিকের শুদ্ধ মানবিক আবেদনকে ফুটিয়ে তোলে। এরপর ইরা তাঁর অনবদ্য পোশাক ও সুনিপুণ নৃত্যভঙ্গিমায় ‘শ্যাম সুন্দর গিরিধারী’ গানের সাথে ভক্তি প্রকাশ করেন। অনন্যা শীলার কণ্ঠে ‘সখী সাজায়ে দে’ এবং হ্যাপির গায়কিতে ‘আমার নিশীথ রাতের বাদল ধারা’ গান দুটি বর্ষার রাতের গভীরতাকে স্পর্শ করে। দুর্যোগপূর্ণ অন্ধকারে কৃষ্ণের জন্য রাধার ব্যাকুলতাকে সৈকত তাঁর মাধুর্যময় কণ্ঠ ও বাঁশির আবহে ফুটিয়ে তোলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৈথিলী ও ব্রজবুলি ভাষার সংমিশ্রণে সৃষ্ট ‘শাওন গগনে’ গানটি পরিবেশন করে তিনি অনুষ্ঠানকে ধ্রুপদি ধারার এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। এর সাথে বৈচিত্র্য যোগ করতে মাইকেল মিত্র ও তানিয়া পরিবেশন করেন রবীন্দ্রসংগীতের চমৎকার মিশ্রণ বা ফিউশন—যেখানে স্থান পায় ‘তোমার হলো শুরু আমার হলো সারা’, ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী উড়ে চলে’, ‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী’ এবং ‘যদি তারে নাই চিনি গো সে কি আমায় নেবে চিনে’ গানগুলো।
বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতার মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার পরম বার্তা ছড়িয়ে দিতে সমবেত কণ্ঠে ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবী’ গানটি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সুর, বাণী ও নৃত্যের এই মায়াবী আয়োজন সমাপ্ত হয়। অনুষ্ঠান শেষে আমন্ত্রিত শিল্পী, পৃষ্ঠপোষক এবং উপস্থিত দর্শকদের প্রতি ধন্যবাদ ও সমাপনী কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন সৈকত ঘোষাল ও মাইকেল মিত্র।
এ আয়োজনে বিশেষ আর্থিক ও সাঙ্গীতিক সহযোগিতার জন্য সারে সিটি কালচারাল অনুদান, বিষ্ণু গোপাল চ্যাটার্জি, লাইক জাইসি বা মাহিন সরকার পরিবার, জহির উদ্দিন, তারিক মালিক, আজাদ শেখ ও রবীণ মহলের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। আয়োজক দল ভ্যাঙ্কুভারের বাংলাদেশ কমিউনিটির উপস্থিত শ্রোতা-দর্শক এবং সারে আর্টস সেন্টারের কর্মীদের প্রতি তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানে।