খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 3শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩২ | ১৭ই মে ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে রাতভর আকাশযুদ্ধ নিয়ে যারা নিবিড়ভাবে নজর রেখেছেন, তারাও হয়তো কিছু ‘বিশাল গুরুত্বপূর্ণ’ ঘটনার খবর মিস করেছেন—যেমন, ভারতীয় নৌবাহিনী করাচি বন্দরে হামলা চালিয়েছে, ভারতীয় সেনা আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করেছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছেন কিংবা সে দেশের সেনাপ্রধানকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এসব শুনে যদি মনে হয় অবিশ্বাস্য লাগছে, তাহলে সেটা স্বাভাবিক। কারণ এসবের কোনোটিই বাস্তবে ঘটেনি। তবু, ভারতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এগুলোকে ‘খবর’ হিসেবে পরিবেশন করেছে, পেছনে বাজছে সাইরেন, স্ক্রিনে ভেসে বেড়াচ্ছে গ্রাফিকস ফাইটার জেট।
একজন উপস্থাপক এও বলেছিলেন, “সব তথ্য যাচাই করেই প্রচার করা হচ্ছে।” কিন্তু এই তথাকথিত খবরের চেয়েও ভয়ঙ্কর ছিল টেলিভিশনের ভাষ্য ও মন্তব্য। একজন সঞ্চালক সরাসরি বলেছিলেন, “করাচিতে আগুন লাগিয়ে দাও, পুরো শহরটা উড়িয়ে দাও।” এক চ্যানেলে এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অপমানসূচকভাবে আক্রমণ করেন, যার জেরে তৈরি হয় কূটনৈতিক উত্তেজনা।
ভারতীয় টিভি সংবাদ অনেক আগেই বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত হয়েছে। রাতভর চ্যানেলগুলোতে সরকার ও প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসায় ভাসানো হয়, বিরোধীদের তিরস্কার করা হয়, সংখ্যালঘু ও বিদেশিদের অবজ্ঞা করা হয়, আর অতিথিদের অপমান করা হয়—তারা সামান্য ভিন্নমত পোষণ করলেই। অনেকের কাছে এটি যেন ‘রেসলিং শো’—শুধু কুস্তিগিরদের জায়গায় স্যুট-পরা সঞ্চালক।
টিভি সংবাদ এখন কার্যত ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর স্বার্থ রক্ষা এবং রাজনৈতিক ‘শত্রুদের’ ধ্বংসে নিয়োজিত। কিন্তু বিশ্লেষক মনীষা পাণ্ডে যেমনটি বলেছেন, “জাতীয়তাবাদী চ্যানেল হলে অন্তত জাতীয় স্বার্থে কাজ করা উচিত।” অথচ ৭ মে কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার জবাবে পাকিস্তানে ভারতের পাল্টা হামলার পর, টিভি চ্যানেলগুলোর ভূমিকা ছিল উল্টো।
যখন কূটনীতিক ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বারবার জোর দিয়ে বলছিলেন—এই হামলা ‘উস্কানিমূলক নয়’—তখন টিভির অতিথিরা চাইছিলেন পাকিস্তান পাল্টা হামলা করুক, যেন ভারত ‘আসল মজা’ নিতে পারে।
মিডিয়ার কাজ যেখানে হওয়া উচিত ছিল সরকারের বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া, সেখানে তা ব্যর্থ হয়েছে। বরং ভারতের ভাবমূর্তি আক্রান্তের বদলে আগ্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
মিডিয়ার ভুলে কে ক্ষতিগ্রস্ত?
ভারতের সাধারণ দর্শকও এই অপপ্রচারের ভুক্তভোগী। ড্রোন হামলা, গণআত্মঘাতী বিস্ফোরণের মতো ভিত্তিহীন গুজব ছড়িয়েছে। সীমান্তের মানুষ—যারা বাস্তব ঝুঁকিতে ছিলেন—তারা সঠিক তথ্য পাননি। অন্য অঞ্চলের মানুষ বোমার ভয় থেকে দূরে থাকলেও মিথ্যা তথ্যের কবলে পড়েছেন। পত্রিকাগুলো কিছুটা নির্ভরযোগ্য ছিল, কিন্তু সংঘর্ষ যেহেতু রাতের বেলা ঘটছিল, তাই খবর পৌঁছাতে দেরি হচ্ছিল। কেবল কিছু ব্যক্তি ও সরকারি ফ্যাক্ট-চেকিং ইউনিট তাৎক্ষণিকভাবে সঠিক তথ্য দিচ্ছিল।
এই বিভ্রান্তির জন্য বিজেপিও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ, টিভি দেখে অনেক ভারতীয়ই মনে করেছিল, মোদীর ‘দৃঢ় নেতৃত্বে’ ভারত পাকিস্তানকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। কিন্তু ১০ মে হঠাৎ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলে সেই প্রত্যাশা ভেঙে পড়ে।
এই হতাশা দ্রুত ক্ষোভে রূপ নেয়। টিভি চ্যানেলের অর্ণব গোস্বামী চিৎকার করে বলেন, “এই তো ট্রাম্পের পুরনো নাটক… গতরাতে আমরা ওদের গুঁড়িয়ে দিচ্ছিলাম… আমি এটা মানি না, আমরা শেষ করেই ছাড়বো।” এর পরপরই সামাজিক মাধ্যমে জাতীয়তাবাদীরা ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে গালিগালাজ শুরু করে।
১২ মে প্রধানমন্ত্রী মোদী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে জানিয়ে দেন যে, পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো আলোচনায় ভারত যাচ্ছে না, বরং তার সরকার বিজয় র্যালি আয়োজন করবে। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই ‘বিজয়ের’ সেই গল্পকে বিশ্বাস করেননি।
এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? অনেকটাই হয়তো সেই গণমাধ্যমই, যারা সত্যের চেয়ে শো-র তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেয়।
খবরওয়ালা/এন