খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 20শে আষাঢ় ১৪৩২ | ৪ই জুলাই ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বহুল উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ‘মব’, অপরটি ‘সংস্কার’—এমন মন্তব্য করেছেন টিভি উপস্থাপক ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক জিল্লুর রহমান।
সম্প্রতি নিজের ইউটিউব চ্যানেলে দেশের সমসাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেভাবে মব তৈরি হয়েছে, প্রতীকী স্থাপনা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত বাসভবন পর্যন্ত হামলার ঘটনা ঘটেছে—তা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে এই দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা আসলে কার হাতে—সরকারের, না কি রাস্তায় জড়ো হওয়া কয়েক শ মানুষের।’
তিনি বলেন, ‘সরকার কি আসলেই মব ঠেকাতে চায়, নাকি তারাও মবে ভয় পায়, অথবা মবকে উসকানি দেয়, অথবা মবের সাহায্যে কিছু সমস্যা শর্টকাটে সমাধান করে ফেলতে চায়।’
জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক মবের ঘটনা সরকার চাইলেই প্রতিরোধ করতে পারত। সেনাবাহিনী মাঠে থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রীয় প্রতীকী ভাস্কর্য ধ্বংস, শিক্ষকের বদলি, নারীদের খেলাধুলার ওপর নিষেধাজ্ঞা—এসব রোধ করা কঠিন কিছু ছিল না। তাহলে কেন কিছুই করা হলো না? এই প্রশ্নটা যে আমি তুললাম, এটা শুধু প্রশাসনিক অক্ষমতা নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছারও বড় ঘাটতি। মবকে জনরোষ হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা দেওয়ার মানে আপনি বিচার ব্যবস্থার বাইরে একটি সন্ত্রাসী সংস্কৃতি তৈরি করছেন।’
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার ওপর হামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তাকে ডিম মেরে, গলায় জুতার মালা পরানো এবং মারধরের ঘটনা—বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সংবিধানের জন্য একটি ভয়ানক অশনি সংকেত। এই ঘটনা ঘটেছে পুলিশের উপস্থিতিতে, রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকায়। একটি সাংবিধানিক পদে থাকা সাবেক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে লক্ষ্য করে।’
তিনি বলেন, ‘এ কথা ঠিক, নুরুল হুদার প্রধান নির্বাচন কমিশনার থাকাকালীন ভূমিকা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ, অসন্তোষ রয়েছে এবং তিনি কোনো ন্যায় কাজ করেননি। কিন্তু তারপরও একটা অন্যায়কে আরেকটা অন্যায় দিয়ে মোকাবেলা করা সমীচীন নয়। সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে নিষ্ঠুর বা অপমানজনক আচরণের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই ধরনের জন আক্রমণ কি নতুন? না, তা নয়। আগের সরকারেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় মব শাস্তির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তা ছিল বিচ্ছিন্ন, সমালোচিত এবং নিন্দিত। আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো—একটির পর একটি মব তৈরি হচ্ছে। কখনো কোনো কলেজ শিক্ষকের বদলি, কখনো নারীদের ফুটবল বন্ধ, কখনো প্রতীকী ভাস্কর্য অপসারণ, আবার কখনো আদালতের মধ্যে আসামির ওপর হামলা।’
‘আর এসবের পেছনে জাস্টিফিকেশন তৈরি করছেন সরকারেরই কেউ কেউ—কখনো প্রেস সচিব, কখনো রাজনৈতিক মুখপাত্র, আবার কখনো জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টারা। একে বলা হচ্ছে জনরোষ বা প্রেশার গ্রুপ—যেন “মব” শব্দটি উচ্চারণ করলেই রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে। এভাবে শব্দ পাল্টে দিয়ে কি বাস্তবতা পাল্টানো যায়? প্রশ্ন কিন্তু এখানেই।’
‘যে সরকার সেনাবাহিনীকে মাঠে রেখেছে, যে সরকার নিজেই বলছে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে জিরো টলারেন্স, সেই সরকারের শাসনামলে যদি দিনের পর দিন একের পর এক মব তৈরি হয়, কেউ কেউ গর্ব করে বলেন “আমরাই তো চাপ দিয়ে কাজ আদায় করছি”—তাহলে আইন, আদালত, রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া সবই তো অর্থহীন হয়ে পড়ে।’
খবরওয়ালা/এন