গত প্রায় সাড়ে সাত থেকে আট বছর ধরে স্যোশাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) তার এক সময়ের লাভজনক অবস্থান থেকে ধ্বংসপ্রায় হয়ে গেছে। ব্যাংকের কার্যক্রমে বিশেষ ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের অনিয়ম ও দুর্নীতি যেমন দায়ী, তেমনি সমানভাবে দায়ী হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। অনিয়মের তথ্য থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ব্যাংকটি সমস্যার মধ্যে ধাক্কা খাচ্ছে।
সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক ও সাবেক চেয়ারম্যান মেজর ডা. রেজাউল হক (অব.)-এর আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, “ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে জোরপূর্বক গোয়েন্দা সংস্থার অফিসে নিয়ে গিয়ে ব্যাংকের মালিকানা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। জীবনের ভয়ে কেউ কিছু বলতে পারেনি।”
নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরেও আশা অনুযায়ী ব্যাংকটি পুনরুদ্ধার হয়নি। সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের অসহযোগিতার কারণে উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডারদের পাশ কাটিয়ে অভিজ্ঞতার অভাবে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের হাতে ব্যাংকের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছিল। গত দেড় বছর ব্যাংকের স্বার্থ বিবেচনা না করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক পরিচালনা করা হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি।
মাহমুদুল হাসান আরও জানান, “এসআইবিএলের খেলাপি ঋণ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারের পরিমাণ এত বেশি, যে ব্যাংককে ঘুরে দাঁড়াতে কমপক্ষে ৮ বছর সময় প্রয়োজন। এত বড় দায় একদিনে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তবে ব্যাংকে আইডিবি ও বড় শিল্পগ্রুপ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, তাই সঠিক সময় ও সুযোগ দিলে ব্যাংক পুনরায় শক্তিশালী হতে পারবে।”
সাবেক চেয়ারম্যান মেজর ডা. রেজাউল হক (অব.) লিখিত বক্তব্যে বলেন, “গত দেড় বছরে যাদের ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা ব্যাংকটিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একক সিদ্ধান্তে শেয়ার শূন্যের মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের বাইরে রাখা হয়েছে। এস আলমের দুর্নীতির দায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপানো হয়েছে। আমরা সরকারের কাছে সুপারিশ করেছি ব্যাংকটি মার্জার প্রক্রিয়া থেকে বের করা হোক এবং সঠিক মালিকদের হাতে হস্তান্তর করা হোক।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ব্যাংকের হাজার হাজার আমানতকারীর টাকা ফেরত দেয়ার কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের সহযোগিতা না পাওয়ায় তাদের ব্যবসা চালাতে সমস্যা ভোগ করছে। অনেকেই লোন না পাওয়ায় ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন।
নিচে সাম্প্রতিক সময়ে এসআইবিএলের গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় |
বর্তমান অবস্থা |
| খেলাপি ঋণের পরিমাণ |
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারের সঙ্গে উচ্চ, লক্ষাধিক কোটি টাকা |
| ব্যাংক পরিচালনা |
সাবেক গভর্নরের অসহযোগিতায় অভিজ্ঞতার অভাবে অনভিজ্ঞদের হাতে |
| শেয়ারহোল্ডার অবস্থা |
উদ্যোক্তাদের পাশ কাটিয়ে নিয়ন্ত্রণ দূরে রাখা হয়েছে |
| আমানতকারীর অবস্থা |
বহু আমানতকারীর টাকা ফেরত দেয়া হয়নি, উদ্বেগের সৃষ্টি |
| বিনিয়োগ সম্ভাবনা |
আইডি, বড় শিল্প গ্রুপ বিনিয়োগের আগ্রহ রয়েছে |
| পুনরুদ্ধারের সময়কাল |
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ৮ বছরের প্রয়োজন |
আইনজীবী ও সাবেক চেয়ারম্যান উভয়ের মতে, ব্যাংকটি পুনরায় শক্তিশালী করতে এখন সঠিক মালিকদের হাতে দায়িত্ব দেওয়া এবং সরকারের সমন্বিত সহায়তা প্রয়োজন। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অসহযোগিতা মোকাবিলার মাধ্যমে এসআইবিএল পুনরায় সাফল্য অর্জন করতে পারে।