মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলায় একটি স্থানীয় সালিশ বৈঠককে কেন্দ্র করে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সামান্য চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডাকা এই বৈঠক শেষ পর্যন্ত রক্তাক্ত সংঘর্ষে রূপ নেয়, যেখানে ফল ব্যবসায়ী জাকির শেখকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিহতের জামাইসহ অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা অভিযুক্তদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়, ফলে এলাকায় চরম আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
মঙ্গলবার সকালে উপজেলার আমগ্রাম ইউনিয়নের মধ্যপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত জাকির শেখ মজুমদারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা এবং রাজৈর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ফলের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি একজন পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন আগে একই এলাকার সোহেল বেপারীর বসতঘরে চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। চুরির ঘটনার জেরে বিরোধ মীমাংসার জন্য মঙ্গলবার সকালে একটি সালিশ বৈঠকের আয়োজন করেন এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। তবে বৈঠকটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ার পরিবর্তে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
অভিযোগ রয়েছে, সালিশ চলাকালে পরিকল্পিতভাবে রাসেল বেপারীকে কুপিয়ে আহত করা হয়। এ সময় তাকে রক্ষা করতে গেলে নারীসহ আরও চারজনকে মারধর ও কুপিয়ে আহত করা হয়। পরে পরিস্থিতি শান্ত করার কথা বলে পুনরায় সালিশের অজুহাতে রাসেলের শ্বশুর জাকির শেখকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনা হয়। সেখানে পৌঁছানোর পরই তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।
স্থানীয়রা দ্রুত আহতদের উদ্ধার করে রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. আল ইয়াসা জাকির শেখকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্য আহতদের চিকিৎসা চলছে বলে জানা গেছে।
ঘটনার পরপরই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্তদের অন্তত চারটি বসতঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালায়।
বর্তমানে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অভিযুক্তরা ঘটনার পর এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
আহত রাসেল বেপারী অভিযোগ করে বলেন, এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। একটি সামান্য চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে এভাবে তার শ্বশুরকে হত্যা করা হবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি। তিনি দ্রুত বিচার দাবি করেছেন।
রাজৈর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কুতুব উদ্দিন জানান, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ ও সাম্প্রতিক চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ইতোমধ্যে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
নিচে ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো—
| বিষয় |
তথ্য |
| ঘটনা |
সালিশ বৈঠক কেন্দ্রিক হত্যাকাণ্ড |
| স্থান |
মধ্যপাড়া, আমগ্রাম ইউনিয়ন, রাজৈর, মাদারীপুর |
| সময় |
মঙ্গলবার সকাল |
| নিহত |
১ জন (জাকির শেখ) |
| আহত |
অন্তত ৫ জন |
| কারণ |
চুরি ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ |
| পরবর্তী অবস্থা |
বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন |
এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করে যে, স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সালিশ প্রথা অনেক সময় সহিংসতার দিকে গড়াতে পারে, যদি তা সুষ্ঠুভাবে ও আইনগত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত না হয়।