খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও মননের জগতে ড. আহমদ শরীফ এক উজ্জ্বল ও প্রতিবাদী নক্ষত্র। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর গভীর গবেষণা তাঁকে দেশ-বিদেশে এনে দিয়েছে বিশেষ সম্মান। যুক্তিবাদ, নির্ভীকতা ও শুদ্ধ বৌদ্ধিক সততার জন্য তিনি ছিলেন এক অনন্য উচ্চতার শিক্ষক—একজন সত্যিকারের জ্ঞানতাপস।
১৯২১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর চাচা ছিলেন প্রখ্যাত পণ্ডিত আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। সাহিত্যবিশারদের সংগৃহীত বিপুল পুঁথি, পাণ্ডুলিপি ও সাময়িকীর ভেতরেই আহমদ শরীফের বেড়ে ওঠা। শৈশব থেকেই তিনি ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সাহিত্যের সঙ্গে গড়ে তোলেন নিবিড় সম্পর্ক।
চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএ (১৯৪০) ও বিএ (১৯৪২) পাস করে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর বাংলা বিভাগে। সেখানে তিনি পান তাঁর প্রিয় শিক্ষক মোহিতলাল মজুমদার ও গণেশচরণ বসু-কে। তাঁদের প্রেরণায় তিনি হয়ে ওঠেন গবেষণামুখী ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার অধিকারী।
কর্মজীবনের শুরুতে দুর্নীতি দমন বিভাগে যোগ দিলেও অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদে ১৯৪৫ সালে চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর শিক্ষকতা করেন কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজে, ফেনী কলেজে এবং কিছুদিন রেডিও পাকিস্তানে। কিন্তু তাঁর আপসহীন ও প্রতিবাদী সত্তা তাঁকে বারবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে।
১৯৫০ সালের ডিসেম্বরে তিনি গবেষণা সহকারী হিসেবে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বিশ্ববিদ্যালয়কে যে ৫৯৭টি অমূল্য পুঁথি দান করেছিলেন, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পড়ে তাঁর ওপর। এই পুঁথিগুলো শুধু সংরক্ষণই নয়, গবেষণার মাধ্যমে তিনি মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যকে নতুন ব্যাখ্যা ও প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেন।
দীর্ঘ ৩৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি ছিলেন এক প্রভাবশালী অধ্যাপক। তাঁর ক্লাস ছিল ঝড়ের মতো—শব্দে, যুক্তিতে, ইতিহাসের বিস্তারে। তাঁর ছাত্রদের একজন হুমায়ুন আজাদ স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, তিনি যেন ক্লাসে ঢুকেই জ্যৈষ্ঠের ঝড় তুলতেন। পায়চারি করতে করতে বক্তৃতা দিতেন, পাঠ্যপুস্তক ছাড়িয়ে নিয়ে যেতেন সভ্যতা ও ইতিহাসের বিস্তৃত প্রান্তরে। তিনি ছিলেন না কোনো “সবাক পাঠ্যপুস্তক”—ছিলেন জীবন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ।
তাঁর রচিত ‘বাঙালি ও বাঙলা সাহিত্য’ (প্রথম খণ্ড ১৯৭৮, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৮৩) আদি ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য বিশ্লেষণে এক অনন্য সংযোজন। যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণ, ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নির্মোহ ভাষ্য তাঁকে আলাদা মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
১৯৮৪ সালে অবসর গ্রহণের পর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষক, গবেষক, প্রাবন্ধিক—সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন মুক্তবুদ্ধির প্রতীক। ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ় ও স্পষ্ট।
২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ সালে তাঁর প্রয়াণ ঘটে। কিন্তু তাঁর চিন্তা, তাঁর যুক্তি, তাঁর সাহসী উচ্চারণ আজও প্রাসঙ্গিক।
ড. আহমদ শরীফ আমাদের শিখিয়েছেন—সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই বুদ্ধিজীবীর প্রথম দায়িত্ব।
শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি এই প্রজ্ঞাবান মনীষীকে।