খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬
“এতক্ষণে” — অরিন্দম কহিলা বিষাদে
ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্য যে কজন অসাধারণ প্রতিভায় নতুন যুগে প্রবেশ করেছিল, মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে স্মরণীয়। তিনি কেবল একজন কবিই নন—নাট্যকার, প্রহসন রচয়িতা এবং বাংলা সাহিত্যের রীতিভাঙা এক বিদ্রোহী পুরোধা।
১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়িতে এক কায়স্থ জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতার দেওয়ানি আদালতের খ্যাতনামা উকিল এবং মাতা জাহ্নবী দেবী। শৈশব থেকেই প্রতিভার দীপ্তি থাকলেও, তাঁর জীবনপথ কখনোই সহজ ছিল না।
যৌবনে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের ফলে পিতৃগৃহ থেকে তাজ্য হন মধুসূদন। এই সিদ্ধান্ত যেমন তাঁকে সমাজ ও পরিবারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে ঠেলে দেয়, তেমনি তাঁর জীবনকে করে তোলে গভীরভাবে নাটকীয় ও বেদনাঘন। বিলাসী জীবনযাপন, অর্থকষ্ট ও মানসিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে তাঁর শেষ জীবন ছিল এক করুণ ট্রাজেডির নামান্তর।
তাঁকে বাংলা নবজাগরণ সাহিত্যের অন্যতম প্রধান পুরোধা হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রচলিত কাব্যরীতির অনুবর্তিতা অস্বীকার করে তিনি যে নব্যধারার সূচনা করেন, তার জন্যই তাঁকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী কবি বলা হয়। পাশ্চাত্য সাহিত্যের গভীর প্রভাবে একসময় তিনি ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন, যদিও সেখানে কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি পাননি।
জীবনের দ্বিতীয় পর্বে মাতৃভাষার প্রতি তাঁর প্রত্যাবর্তন বাংলা সাহিত্যকে দেয় এক ঐতিহাসিক প্রাপ্তি। এই সময়েই তিনি রচনা করেন বাংলা নাটক, প্রহসন ও কাব্য—যেগুলো ভাষা ও আঙ্গিক উভয় দিক থেকেই যুগান্তকারী। বাংলা সাহিত্যে সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক হিসেবেও তাঁর নাম চিরস্মরণীয়।
অমিত্রাক্ষর ছন্দে রামায়ণের উপাখ্যান অবলম্বনে রচিত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি—যেখানে বিদ্রোহী কণ্ঠ, মানবিক বোধ এবং আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।
১৮৭৩ সালের ২৯ জুন, মাত্র ৪৯ বছর বয়সে এই অপরিণামদর্শী প্রতিভার জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর বিদ্রোহ, তাঁর ভাষা ও তাঁর স্বপ্ন আজও বাংলা সাহিত্যকে আলোকিত করে চলেছে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি—মাইকেল মধুসূদন দত্ত।