খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 10শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ২২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
“হাসি হাসি পরবো ফাঁসি,
দেখবে জগৎবাসী—
একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।”
বাংলার স্বদেশী চেতনার অগ্নিস্বর, চারণ কবি মুকুন্দ দাস ছিলেন একাধারে কবি, যাত্রাপালা রচয়িতা, সুরকার এবং বিপ্লবী প্রেরণার অগ্রদূত। ১৮৭৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর পরগণার বানরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা গুরুদয়াল দে ও মাতা শ্যামাসুন্দরী দেবী তাঁকে জন্মকালে নাম দেন যজ্ঞেশ্বর দে, তবে পরে বৈষ্ণব সন্ন্যাসী রামানন্দ অবধূতের দীক্ষায় তিনি হয়ে ওঠেন ‘মুকুন্দ দাস’ এবং ইতিহাসে অমর হন ‘চারণ কবি’ নামে।
শৈশবে পদ্মা নদীর ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে পরিবারসহ বরিশালে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি কীর্তনদলে যোগ দিয়ে অল্প সময়ে সুকণ্ঠ গায়ক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। মাত্র উনিশ বছর বয়সে রচিত ‘সাধনসঙ্গীত’ সংকলনে একশো গানের মাধ্যমে তাঁর অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়।
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন (১৯০৫) এবং পরবর্তী স্বদেশী ও অসহযোগ আন্দোলনে মুকুন্দ দাসের গান ও যাত্রাপালা বাঙালির হৃদয়ে উত্তেজনা এবং দেশপ্রেমের সঞ্চার করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা:
| রচনা | বিষয়বস্তু | প্রভাব |
|---|---|---|
| মাতৃপূজা | মাতৃভক্তি ও দেশপ্রেম | নাটক বাজেয়াপ্ত, বিপ্লবী প্রেরণা |
| সমাজ | সামাজিক সজাগতা | সাধারণ মানুষকে চিন্তাশীল করে তোলা |
| পথ | জীবনদর্শন ও নৈতিকতা | মানবিক মূল্যবোধে প্রভাব |
| পল্লীসেবা | গ্রামীণ উন্নয়ন ও সমাজসেবা | গ্রামাঞ্চলে জনগণের চেতনা বৃদ্ধি |
| কর্মক্ষেত্র | শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সংগ্রাম | শ্রমজীবী জনগণকে অনুপ্রাণিত করা |
ব্রিটিশবিরোধী বক্তব্যের কারণে তাঁকে গ্রেফতার করে দিল্লি কারাগারে আড়াই বছরের সশ্রম দণ্ড দেওয়া হয়, এবং ‘মাতৃপূজা’ নাটক বাজেয়াপ্ত হয়।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ-এর আমন্ত্রণে কলকাতায় যাত্রাপালা মঞ্চস্থ করেন। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি ও আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু-এর বাড়িতেও তাঁর পরিবেশনা প্রশংসিত হয়। এমনকি কাজী নজরুল ইসলামও তাঁকে সাক্ষাৎ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে গান গেয়ে মানুষের মনে স্বাধীনতার দীপ জ্বালিয়েছেন। তিনি ছিলেন কেবল কবি নন, বরং জনগণের কণ্ঠস্বর এবং সংগ্রামের প্রেরণা।
১৯৩৪ সালের ১৮ মে চারণ কবি মুকুন্দ দাসের অগ্নিকণ্ঠ থেমে যায়। তবে তাঁর গান আজও উচ্চারণ করে—দেশমাতৃকার জন্য জীবনও তুচ্ছ।
গভীর শ্রদ্ধা ও স্মৃতির সঙ্গে স্মরণ করি চারণ কবি মুকুন্দ দাসকে।