খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 7শে মাঘ ১৪৩২ | ২০ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলা ভাষা, শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের ইতিহাসে মাদার বকশ এক অনন্য নাম। তিনি একাধারে ভাষা সৈনিক, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা—যাঁর জীবনজুড়ে ছিল জ্ঞানচর্চা, মানবমুক্তি ও নৈতিক সাহসের নিরবচ্ছিন্ন সাধনা।
১৯০৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি নাটোর জেলার চলনবিল অধ্যুষিত বনলতা সেনখ্যাত অঞ্চলের স্থাপনদীঘি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মাদার বকশ। তাঁর জন্ম এক সাধারণ কৃষক পরিবারে হলেও শৈশব থেকেই তিনি অসাধারণ মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দেন। আর্থিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করেই তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন শিক্ষার আলোয় আলোকিত একজন মানুষ হিসেবে।
১৯২২ সালে সিংড়ার চৌগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর রাজশাহী কলেজ থেকে ১৯২৪ সালে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯২৬ সালে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার প্রতি অদম্য আকাঙ্ক্ষা তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যায়—১৯২৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ এবং ১৯২৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আইনশাস্ত্রে বিএল ডিগ্রি লাভ করেন। এই শিক্ষাজীবনই তাঁকে পরিণত করে এক প্রজ্ঞাবান ও প্রগতিশীল চিন্তাবিদে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তিম পর্যায়ে তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৬ সালে রাজশাহীর বাগমারা ও নওগাঁ জেলার আত্রাই এবং মান্দা অঞ্চল থেকে তিনি আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। একই সময়ে রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি দক্ষতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে ক্ষমতার রাজনীতি কখনোই তাঁর নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারেনি। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা এবং জনগণের অধিকার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। এই দৃঢ় অবস্থানের কারণে নিজ দল মুসলিম লীগের সঙ্গেই তাঁর বিরোধ সৃষ্টি হয়। দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচরণ করে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। ভাষার প্রশ্নে সরকারের অবস্থান ও দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে মতানৈক্য ক্রমে তাঁকে মূলধারার রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু রাজনীতি থেকে সরে গেলেও সমাজ ও শিক্ষার প্রশ্নে তাঁর দায়বদ্ধতা কখনো কমেনি।
শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর চিন্তা, উদ্যোগ ও সক্রিয় ভূমিকা উত্তরবঙ্গের শিক্ষাবিকাশে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে আছে। আজকের বহু আলোকিত প্রজন্ম পরোক্ষভাবে ঋণী এই দূরদর্শী শিক্ষাবিদের কাছে।
এক বর্ণাঢ্য, কর্মময় ও সংগ্রামী জীবনের শেষে দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৬৭ সালের ২০ জানুয়ারি তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁকে রাজশাহীর কাদিরগঞ্জ গোরস্থানে সমাহিত করা হয়।
তাঁকে স্বরণীয় করে রাখতে তাঁর নামর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ছাত্র হলের নাম মাদারবকশ হল নামে নাম করন করা হয়।
মাদার বকশ ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁরা ক্ষমতার চেয়ে মূল্যবোধকে বড় করে দেখেছেন, সুবিধার চেয়ে সত্যকে বেছে নিয়েছেন। ভাষা, শিক্ষা ও ন্যায়বোধের প্রশ্নে তাঁর নির্ভীক অবস্থান আজও আমাদের জন্য প্রেরণার উৎস।
শ্রদ্ধাঞ্জলি শিক্ষাবিদ ও ভাষা সৈনিক মাদার বকশ।