খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপান। দেশটির সরকার জানিয়েছে, বিদ্যমান আইনগত সীমাবদ্ধতা এবং শান্তিবাদী সংবিধানের কারণে এই মুহূর্তে ওই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি সিদ্ধান্ত।
জাপানের ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নীতি নির্ধারণী প্রধান তাকায়ুকি কোবায়াশি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ পাঠানো আইনি ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই জটিল। তিনি উল্লেখ করেন, জাপানের প্রচলিত আইনে বিদেশে সামরিক অভিযান বা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নৌবাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের পক্ষে সহজ নয়।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশকে তাদের নিজস্ব তেলবাহী ট্যাঙ্কারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে সহযোগিতা চেয়েছে। এই আহ্বানের প্রেক্ষিতেই জাপানের অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই প্রণালি দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছে যায়। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
নিচের সারণিতে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| অবস্থান | পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী সামুদ্রিক পথ |
| দৈর্ঘ্য | প্রায় ১৬০ কিলোমিটার |
| প্রস্থ | সংকীর্ণ স্থানে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার |
| দৈনিক তেল পরিবহন | আনুমানিক বিশ্ব তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ |
| সংশ্লিষ্ট দেশ | ইরান, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ পার্শ্ববর্তী উপসাগরীয় অঞ্চল |
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। দেশটির ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে এবং সেই তেলের অধিকাংশই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে জাপানে পৌঁছে। ফলে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা জাপানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশটি সবসময় সতর্ক অবস্থান বজায় রাখে।
জাপানের সংবিধানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি অনুসরণ করা হয়, যা মূলত শান্তিবাদী আদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই সংবিধান অনুযায়ী, জাপান আক্রমণাত্মক সামরিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাই বিদেশে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশটির সরকারকে কঠোর আইনগত সীমাবদ্ধতা মেনে চলতে হয়।
তাকায়ুকি কোবায়াশি আরও বলেন, বিদ্যমান আইনের কারণে হরমুজ প্রণালিতে নৌবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনাকে পুরোপুরি বাতিল করা না গেলেও বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ এ ধরনের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান সত্ত্বেও জাপান সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে টোকিও এখনো পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংযত ও রক্ষণশীল নীতিই অনুসরণ করে যাচ্ছে।