খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন এক অভাবনীয় ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাতের রেশ ধরে তেহরান বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালী’ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরকে সংযুক্তকারী এই অত্যন্ত সরু কিন্তু কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথটি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে এক মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশেষ নেভাল মিশন ‘এসপাইডেস’-এর একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে এই নৌপথ দিয়ে সকল প্রকার জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ করেছে। তাদের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, “পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী দিয়ে আর কোনো বাণিজ্যিক বা সামরিক জাহাজ অতিবাহিত হতে দেওয়া হবে না।” ইরানের এই কঠোর পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানের পাল্টা জবাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী কেবল একটি জলপথ নয়, এটি বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য একমাত্র নির্ভরযোগ্য রপ্তানি রুট। সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতের মতো দেশগুলো তাদের উৎপাদিত তেলের সিংহভাগ এই পথেই বিশ্ববাজারে পাঠায়। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ।
নিচে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব ও এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন প্রধান দিকগুলোর একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| বিষয়ের নাম | পরিসংখ্যান ও গুরুত্ব | সম্ভাব্য প্রভাব |
| দৈনিক তেল পরিবহন | প্রায় ২ কোটি ব্যারেল। | বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ২০% হ্রাস পাবে। |
| নির্ভরশীল দেশসমূহ | সৌদি আরব, ইউএই, কুয়েত, ইরাক। | এসব দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি আয় মুখ থুবড়ে পড়বে। |
| জ্বালানি মূল্য | প্রতি ব্যারেল তেলের দাম। | ব্যারেল প্রতি মূল্য ২০০ ডলার ছাড়ানোর আশঙ্কা। |
| বৈশ্বিক এলএনজি (LNG) | কাতার ও ওমানের গ্যাস সরবরাহ। | ইউরোপ ও এশিয়ায় ভয়াবহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। |
এই নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন (Supply Chain) সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচ ইতোমধ্যেই কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। লজিস্টিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাহাজগুলোকে এখন আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে, যা পণ্যের দাম এবং সময় উভয়ই বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। বিশেষ করে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বড় ধাক্কার মুখে পড়বে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি এক ভয়াবহ দুঃসংবাদ। আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ ও কৃষি উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে দুর্বিষহ করে তুলবে।
জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে নৌপথটি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে ইরান তার অবস্থানে অনড়। তেহরান দাবি করছে, তাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানার পর তারা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী নিজেদের জলসীমা সুরক্ষার অধিকার রাখে। ওয়াশিংটন এই পরিস্থিতিকে ‘বৈশ্বিক উস্কানি’ হিসেবে অভিহিত করে সামরিক হস্তান্তরের ইঙ্গিত দিয়েছে। সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালীর এই অচলাবস্থা কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যদি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে না পারে, তবে আগামী কয়েক দিনেই বিশ্বজুড়ে চরম জ্বালানি হাহাকার ও চরম মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে—যা সামলানো বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।