খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫
দেশের বেসরকারি শিক্ষাখাতে বড় ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের আরেকটি চিত্র আবারো সামনে এসেছে। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) নতুন করে এক হাজার ১৭২ জন জাল সনদধারী শিক্ষক-কর্মচারীকে শনাক্ত করেছে—যা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে জাল সনদে শিক্ষকতা করা এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শুধু চাকরির যোগ্যতার জালিয়াতিই নয়, বরং বেতন-ভাতা গ্রহণ, ভুয়া নিয়োগ, ভ্যাট ও আয়কর অনিয়ম এবং আর্থিক আত্মসাতের মতো বহু অপরাধের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অনিয়ম মিলিয়ে ২৫৩ কোটি টাকা ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম জানান, জাল সনদধারীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং খুব শিগগিরই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তালিকা পাঠানোর পর মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হবে। তিনি বলেন, “এত বড় সংখ্যক জাল সনদধারী শিক্ষক শনাক্ত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিকে আঘাত করেছে এসব অনিয়ম।”
ডিআইএর নথি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাল সনদধারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন রাজশাহী বিভাগে—মোট ৭৭৯ জন। এটি মোট সংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি, যা দেখায় এই অঞ্চলে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই নজরদারি ও যাচাই–বাছাই যথেষ্ট দুর্বল ছিল। মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরেও ১২০ জন জাল সনদধারী শিক্ষক শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া খুলনা বিভাগে ১৭৯ জন, ঢাকা বিভাগে ৭০ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪ জনের সনদ জাল বলে প্রমাণিত হয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, শনাক্ত হওয়া এক হাজার ১৭২ জনের মধ্যে প্রায় ৪০০ জনের সনদ সম্পূর্ণ জাল। অর্থাৎ, তারা কোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই সংশ্লিষ্ট ডিগ্রি অর্জন করেননি—বরং সম্পূর্ণ ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে শিক্ষকতা করে আসছিলেন। আরও ৩০০ জনের সনদকে “অগ্রহণযোগ্য” বা “জটিল” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার মানে সনদের উৎস, নম্বর বা যাচাইকরণে গুরুতর অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
ডিআইএ প্রথম ধাপে ৪০০ জনের তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে বলে জানিয়েছে। এই তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা—যেমন চাকরি বাতিল, বেতন-ভাতা ফেরত, ফৌজদারি মামলা দায়ের—সংক্রান্ত সুপারিশও করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা খাতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার দুর্বলতা, যাচাই–বাছাইয়ের অভাব এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতির কারণেই এত বড় জালিয়াতি দীর্ঘসময় টিকে গেছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন ঘটনায় শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, শিক্ষার মানও ভয়াবহভাবে ব্যাহত হয়েছে। জাল সনদধারী ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন শিশু-কিশোরদের পাঠদানের দায়িত্ব পালন করেছেন, যা শিক্ষার গুণগত মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তারা বলছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন এবং সার্টিফিকেট যাচাই ব্যবস্থা আরও কঠোর করা এখন সময়ের দাবি।
ডিআইএর এই প্রতিবেদন শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করলেও, এটি একই সঙ্গে সংস্কারের নতুন সুযোগও তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং নিয়োগ–যাচাই প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।