খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 10শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ২৫ই জুলাই ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
দেশজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ খরচ কমিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। মৌলিক প্রয়োজন—অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই খরচের চাপ সহ্য করতে হিমশিম খাচ্ছে নাগরিকরা। এমন বাস্তবতায় সরকার শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি নতুন পে কমিশন গঠন করেছে। তবে বেসরকারি খাতের বিপুলসংখ্যক কর্মজীবীর আয় বাড়াতে এখনো কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে করে সামাজিক বৈষম্য আরও প্রকট হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নতুন পে কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। সাবেক অর্থসচিব ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খানকে কমিশনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কমিশনকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম জানান, ১০ বছর পর দেশে নতুন পে কমিশন গঠিত হলো।
উল্লেখ্য, গত সরকার আমলে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্ক ছাড়িয়েছিল। যদিও বর্তমানে তা কিছুটা কমে এসেছে, তবুও তা সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। সরকারি বক্তব্যে বলা হচ্ছে, বেতন স্কেলের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সমন্বয় আনতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাচ্ছে। বিনিয়োগ না বাড়ায় নতুন চাকরি তৈরি হচ্ছে না। অনেকেই বাধ্য হয়ে সঞ্চয় ভেঙে জীবন চালাচ্ছেন। সরকারি বেতন বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “মূল্যস্ফীতির চাপ শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের ওপর নয়, বরং বেসরকারি খাতেও এই চাপ রয়েছে। দীর্ঘদিন বেসরকারি খাতে বেতন বাড়েনি। ফলে সরকারি বেতন বাড়লে বেসরকারি চাকরিজীবীরা আরও বিপাকে পড়বেন। সরকারের হাতে অর্থ সংকট রয়েছে। তাই এই উদ্যোগ বৈষম্য তৈরি করতে পারে।”
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১১.৬৬ শতাংশ। বছরের শেষ পর্যন্ত তা দুই অঙ্কের ঘরেই ছিল। চলতি বছরে তা কিছুটা কমে জুনে ৮.৪৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ভোক্তারা এখনও প্রায় ১০ শতাংশ বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক পণ্যের দাম কমলেও অন্য পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাচ্ছে না। প্রধান খাদ্যপণ্য চালের দাম এখনও ঊর্ধ্বমুখী। এই অবস্থায় শুধুমাত্র সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ালে বেসরকারি চাকরিজীবীদের ওপর দ্বিগুণ চাপ সৃষ্টি হবে।
শ্রমবাজারের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ছয় কোটি মানুষ কর্মজীবী। এর মধ্যে সাড়ে পাঁচ কোটিই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। করোনার পর থেকে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের আয় বাড়েনি। বাড়িভাড়া, খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে তারা নিদারুণ চাপের মুখে পড়েছে।
বর্তমানে দেশের প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ২০১৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী বেতন পান। সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা, এমপিওভুক্ত শিক্ষকসহ মোট সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২২ লাখে। সরকার তাদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর কথা ভাবলেও বাকি কোটি কর্মজীবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো দিকনির্দেশনা দেয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈষম্যমূলক উদ্যোগ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যদি না বেসরকারি খাতকেও অন্তর্ভুক্ত করে সার্বিকভাবে আয় বৃদ্ধির কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ করা হয়।
খবরওয়ালা/শরিফ