খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
আসন্ন ৪৮ দলের ফিফা বিশ্বকাপে রেকর্ডসংখ্যক ১০টি আফ্রিকান দেশ অংশ নিতে যাচ্ছে, যা মহাদেশটির ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। বিগত কাতার বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে মরক্কো সেমিফাইনালে পৌঁছে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। এবারের আসরে প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে পা রাখছে কেপ ভার্দে এবং ১৯৭৪ সালের পর দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে বিশ্বকাপে প্রত্যাবর্তন করেছে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো)। আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য এই বিশ্বযজ্ঞে আফ্রিকার সাতজন প্রতিভাবান ও তারকা খেলোয়াড়ের ওপর বিশেষ নজর রেখেছে বৈশ্বিক গণমাধ্যম বিবিসি স্পোর্টস।
বিশ্বকাপের মূল পর্বে অংশ নিতে যাওয়া দলগুলোর মধ্যে আফ্রিকার এমন সাতজন ফুটবলারকে নির্বাচন করা হয়েছে, যাঁরা নিজ নিজ ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে সাম্প্রতিক সময়ে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন। এই খেলোয়াড়দের অবস্থান, ক্লাব এবং বিশেষ অর্জনের বিবরণ নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| খেলোয়াড়ের নাম | জাতীয় দল ও অবস্থান | বর্তমান ক্লাব দল | বিশেষ কৃতিত্ব ও নজর কাড়ার কারণ |
| ১. আন্তোয়ান সেমেনিয়ো | ঘানা (ফরোয়ার্ড) | ম্যানচেস্টার সিটি | চেলসির বিপক্ষে এফএ কাপের ফাইনালে জয়সূচক গোল করে সিটিকে শিরোপা জেতান। |
| ২. ইয়ান ডিওমান্ডে | আইভরি কোস্ট (তারকা) | আরবি লাইপজিগ | বুন্দেসলিগায় ১২ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট করে ‘রুকি অফ দ্য সিজন’ পুরস্কার জয়। |
| ৩. রনওয়েন উইলিয়ামস | দক্ষিণ আফ্রিকা (গোলরক্ষক) | মামেলোডি সানডাউনস | আফ্রিকা নেশনস কাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে পেনাল্টি শুটআউটে ৪টি শট প্রতিহত করেন। |
| ৪. রোবার্তো ‘পিকো’ লোপেস | কেপ ভার্দে (ডিফেন্ডার) | শারমক রোভার্স | লিংকডইনের বার্তার মাধ্যমে দলে অন্তর্ভুক্তি; বাছাইপর্বে ক্যামেরুনকে পেছনে ফেলে মূল পর্বে কোয়ালিফাই। |
| ৫. ব্রাহিম দিয়াজ | মরক্কো (উইঙ্গার) | রিয়াল মাদ্রিদ | ২০২৫ আফ্রিকা নেশনস কাপের গোল্ডেন বুট বিজয়ী ও তিনটি ভিন্ন ইউরোপীয় শীর্ষ লিগ জয়ী। |
| ৬. ইসমাইলা সার | সেনেগাল (উইঙ্গার) | ক্রিস্টাল প্যালেস | ২০২১ নেশনস কাপ জয়ী এবং ২০২৫ আসরে সেনেগালকে ফাইনালে তোলার মূল কারিগর। |
| ৭. ওমর মারমুশ | মিসর (উইঙ্গার) | ম্যানচেস্টার সিটি | গতি ও ড্রিবলিংয়ের জন্য বিখ্যাত; মোহাম্মদ সালাহর সঙ্গে মিসরের অন্যতম প্রধান আক্রমণভাগ। |
লন্ডনে জন্মগ্রহণকারী ঘানা জাতীয় দলের এই ফরোয়ার্ড সাম্প্রতিক সময়ে দারুণ ফর্মে রয়েছেন। গত মাসে চেলসির বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত এফএ কাপের ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে তিনি অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন এবং দলের পক্ষে জয়সূচক গোলটি করে শিরোপা নিশ্চিত করেন। তবে ঘরোয়া লিগে দুর্দান্ত খেললেও ম্যানচেস্টার সিটিকে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জেতাতে ব্যর্থ হন এই স্ট্রাইকার।
২০১৪ সালের পর আবার ফুটবল বিশ্বকাপে প্রত্যাবর্তন করেছে ‘দ্য এলিফ্যান্টস’ খ্যাত আইভরি কোস্ট। কিংবদন্তি ফুটবলার দিদিয়ে দ্রগবার পর ১৯ বছর বয়সী ইয়ান ডিওমান্ডেকে দেশটির ফুটবল ইতিহাসের সেরা তারকা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জার্মান বুন্দেসলিগার ক্লাব লাইপজিগের হয়ে সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে তিনি ১২টি গোল এবং ৮টি অ্যাসিস্ট করেছেন। তাঁর এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই লাইপজিগ লিগে তৃতীয় স্থান অর্জন করে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে পুনরায় ফিরে আসে, যা ২০২৪/২৫ মৌসুমে অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল ক্লাবটি। মৌসুমে দুর্দান্ত খেলার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বুন্দেসলিগার ‘রুকি অফ দ্য সিজন’ পুরস্কার জিতে নেন।
২০১০ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ আয়োজনের পর এবারই প্রথম আবার মূল পর্বে অংশ নেবে দক্ষিণ আফ্রিকা। অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ও জাতীয় দলের অধিনায়ক রনওয়েন উইলিয়ামসের ওপর ভর করে দলটি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে যাওয়ার স্বপ্ন বুনছে। উইলিয়ামস মূলত আফ্রিকা নেশনস কাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে কেপ ভার্দের বিপক্ষে পেনাল্টি শুটআউটে অবিশ্বাস্যভাবে চারটি স্পট কিক ঠেকিয়ে বিশ্ব ফুটবলে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
কেপ ভার্দে ফুটবল দলের রক্ষণভাগের মূল ভিত্তি বা অনড় প্রাচীর হলেন ৩৩ বছর বয়সী রোবার্তো ‘পিকো’ লোপেস। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে জন্ম নেওয়া এবং আইরিশ ঘরোয়া ক্লাব শারমক রোভার্সের এই ডিফেন্ডারের আন্তর্জাতিক ফুটবলে আসার গল্পটি বেশ রোমাঞ্চকর। ২০১৯ সালে কেপ ভার্দের তৎকালীন কোচ তাঁকে পেশাদার যোগাযোগ মাধ্যম ‘লিংকডইন’ (LinkedIn)-এ জাতীয় দলে খেলার প্রস্তাব দিয়ে একটি বার্তা পাঠান। বার্তাটি পর্তুগিজ ভাষায় হওয়ায় লোপেস প্রথমে সেটিকে স্প্যাম মনে করে প্রায় নয় মাস অবহেলা করেন। পরবর্তীতে গুগল ট্রান্সলেটের সাহায্যে অনুবাদ করার পর, তিনি তাঁর কেপ ভার্দিয়ান বাবার সূত্রে দেশটির হয়ে খেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
লোপেসের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব ফুটবলে এক অভাবনীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে কেপ ভার্দে। দলটি ২০২৩ আফ্রিকা নেশনস কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছায় এবং আফ্রিকান অঞ্চলের ‘গ্রুপ ডি’ থেকে ২০৬ ফিফা বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে। বাছাই পর্বে আফ্রিকার অন্যতম ফুটবল পরাশক্তি ক্যামেরুনকে পেছনে ফেলে তারা গ্রুপে শীর্ষস্থান দখল করে সরাসরি মূল পর্বে কোয়ালিফাই করে।
রিয়াল মাদ্রিদের উইঙ্গার এবং মরক্কোর তারকা ব্রাহিম দিয়াজ ২০২৫ সালের আফ্রিকা নেশনস কাপে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। পুরো টুর্নামেন্টে ৫টি গোল করে তিনি আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘গোল্ডেন বুট’ লাভ করেন এবং মরক্কোকে ফাইনালে তুলতে মূল ভূমিকা পালন করেন। তবে ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় লড়াইয়ে সেনেগালের কাছে হেরে রানার্স-আপ হতে হয় মরক্কোকে। ব্রাহিম দিয়াস ইউরোপের শীর্ষ ৩টি ভিন্ন ভিন্ন ঘরোয়া লিগ জেতা অন্যতম তরুণ খেলোয়াড়। তিনি ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে প্রিমিয়ার লিগ, এসি মিলানের হয়ে সিরি আ এবং রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে লা লা লিগা ও উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় করার অনন্য কীর্তি গড়েছেন।
সেনেগালের অত্যন্ত প্রতিভাবান ও গতিশীল পেশাদার ফুটবলার ইসমাইলা সার বর্তমানে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ক্রিস্টাল প্যালেস এবং সেনেগাল জাতীয় দলের হয়ে ফরোয়ার্ড বা উইঙ্গার হিসেবে খেলছেন। সেনেগালের হয়ে ২০২১ সালের ঐতিহাসিক আফ্রিকান নেশনস কাপ জয়ে তিনি মাঠের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের আসরেও তিনি সেনেগালকে ফাইনালে তুলতে বড় অবদান রাখেন। আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপ স্কোয়াডেও সেনেগাল দলের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এই উইঙ্গারকে।
মিসর জাতীয় দলের তারকা উইঙ্গার ওমর মারমুশ বর্তমানে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের জায়ান্ট ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিতে খেলছেন। গতি, দুর্দান্ত ড্রিবলিং এবং নিখুঁত গোল করার ক্ষমতার জন্য মারমুশকে বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় আফ্রিকান ফরোয়ার্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিংবদন্তি মোহাম্মদ সালাহর পাশাপাশি তিনি আসন্ন বিশ্বকাপে মিসরের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা।