খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 30শে চৈত্র ১৪৩২ | ১৩ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)। ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ সমগ্র রাখাইন রাজ্যের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে গোষ্ঠীটি। শুক্রবার (১০ এপ্রিল, ২০২৬) আরাকান আর্মির ১৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে গোষ্ঠীটির প্রধান জেনারেল তোয়ান ম্রাত নাইং এই পরিকল্পনার কথা জানান।
২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর থেকে রাখাইন ও চিন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে আরাকান আর্মি। বিগত আড়াই বছরেরও কম সময়ে তারা রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা থেকে সামরিক জান্তাকে হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের ১৭টি উপজেলার মধ্যে ১৪টিই সম্পূর্ণভাবে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী চিন রাজ্যের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পালেতওয়া এলাকাটিও তাদের দখলে।
বর্তমানে মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর হাতে কেবল রাজধানী সিত্তওয়ে, গভীর সমুদ্রবন্দর সংলগ্ন কিয়াকফিউ এবং দ্বীপ অঞ্চল মানাউং শহর অবশিষ্ট রয়েছে। জেনারেল তোয়ান ম্রাত নাইং তার বক্তব্যে আত্মবিশ্বাসের সাথে জানান, তারা তাদের লক্ষ্য অর্জনে অবিচল এবং জান্তা সরকারের পতন নিশ্চিত করতে অন্যান্য মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে যৌথ অভিযান অব্যাহত রাখবেন।
আরাকান আর্মি কেবল সামরিক বিজয় অর্জনই করেনি, বরং তারা তাদের দখলকৃত এলাকাগুলোতে একটি সমান্তরাল প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এই অঞ্চলগুলোতে বর্তমানে গোষ্ঠীটির নিজস্ব তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে:
স্বতন্ত্র বিচারিক আদালত।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল)।
জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র।
স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।
তবে জান্তা বাহিনী তাদের হারানো এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় নিয়মিত বিমান ও নৌ-হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়াচ্ছে বেসামরিক স্থাপনা, যার ফলে রাখাইন জুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাস্তুচ্যুতির হার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
নিচে রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা ও বর্তমান পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা ও পরিসংখ্যান |
| মোট উপজেলা (রাখাইন) | ১৭টি |
| আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে | ১৪টি উপজেলা ও পালেতওয়া (চিন রাজ্য) |
| জান্তার নিয়ন্ত্রণে | সিত্তওয়ে, কিয়াকফিউ ও মানাউং |
| অভিযান শুরুর তারিখ | ১৩ নভেম্বর, ২০২৩ |
| প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী | ১৭তম (১০ এপ্রিল) |
| অন্যান্য কার্যক্রম | নিজস্ব প্রশাসন, আদালত ও স্বাস্থ্যসেবা |
আরাকান আর্মির এই অভাবনীয় উত্থান মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ২০০৯ সালের ১০ এপ্রিল কাচিন রাজ্যের লাইজা নামক স্থানে মাত্র ২৬ জন সদস্য এবং একটি মাত্র আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এই গোষ্ঠীটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৭ বছর পর আজ তারা কয়েক হাজার প্রশিক্ষিত সদস্য ও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত একটি শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত হয়েছে, যা মিয়ানমার জান্তার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সাফল্য উপলক্ষে ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের সদস্যসহ মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) এবং আরও ৪০টিরও বেশি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মিকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, আরাকান আর্মির সামরিক ও প্রশাসনিক এই অর্জন মিয়ানমারের অন্যান্য জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর জন্য একটি অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করছে। জান্তা বিরোধী লড়াইয়ে এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।