খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 7শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ১৯ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ফুটবল বিশ্বের কিংবদন্তি লিওনেল মেসির দেশ আর্জেন্টিনা এখন এক চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। মাঠের ফুটবলে বিশ্বজয়ের আনন্দ থাকলেও, দেশটির সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে এখন হাহাকার। আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি আর ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে পড়ে নাগরিকরা এখন মৌলিক চাহিদা যেমন—খাবার এবং ওষুধের খরচ মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন অথবা ঘরের আসবাবপত্র বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে, ক্রেডিট কার্ডের ওপর অতিনির্ভরশীলতা দেশটিকে এক ভয়াবহ ঋণচক্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বুয়েনস আইরেসের গ্র্যান্ডে ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন সঞ্চয় ভেঙে অথবা ধার করে সংসার চালাচ্ছেন। ৪৩ বছর বয়সি বিক্রেতা দিয়েগো নাকাশিওর মতো হাজারো মানুষের গল্প এখন একই সুতোয় গাঁথা। মাসের ১৫ তারিখ পার হওয়ার আগেই বেতন শেষ হয়ে যাওয়ায় মাসের বাকি দিনগুলোতে খাবারের জোগান দিতে তাঁদের ছোটখাটো ঋণ বা বাড়তি অমানুষিক পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
আর্জেন্টিনার বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মূল সূচকসমূহ:
| সূচকের নাম | বর্তমান অবস্থা ও প্রভাব |
| খাদ্যদ্রব্য ক্রয় | বিগত বছরের তুলনায় ১২.৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। |
| ব্যক্তিগত ঋণ খেলাপি | ১১ শতাংশ (যা ২০১০ সালের পর সর্বোচ্চ)। |
| সুপারমার্কেট কেনাকাটা | প্রায় ৫০ শতাংশ লেনদেন এখন ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। |
| বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় | মুদ্রাস্ফীতির হারের চেয়েও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। |
| আর্থিক সক্ষমতা | প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা বর্তমানে সঞ্চয়হীন বা ঋণগ্রস্ত। |
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে রক্ষণশীল নেতা হাভিয়ের মিলেই ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকারি ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে অর্থনীতিতে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছেন। তাঁর ‘শক থেরাপি’ হিসেবে পরিচিত কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতি যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দৃষ্টিতে ২০২৬ ও ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখাচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনে এর প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। ব্যাংকিং ও কৃষি খাতে সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও উৎপাদন এবং খুচরা বিক্রয় খাতে ব্যাপক ধস নেমেছে। ফলে মাঠপর্যায়ের চিত্র এবং সরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
আর্জেন্টিনার ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ পাওয়ার শর্ত কঠিন হওয়ায় মানুষ এখন অনানুষ্ঠানিক বা চড়া সুদের মহাজনদের দ্বারস্থ হচ্ছে। ব্যক্তিগত ঋণ খেলাপি হওয়ার হার ১১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। স্কুল শিক্ষক ভেরোনিকা মালফিতানোর মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা এখন একা বাজার করার সামর্থ্য হারিয়েছেন। তাঁরা এখন পরিবার বা সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে পাইকারি দরে পণ্য কিনছেন এবং ক্রেডিট কার্ডের কেবল ‘ন্যূনতম পাওনা’ (Minimum Due) পরিশোধ করে কোনোমতে দিন অতিবাহিত করছেন। এটি আর্জেন্টিনাকে একটি দীর্ঘমেয়াদী ঋণচক্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন হতে পারে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ লুসিয়া ক্যাভালেরো এই পরিস্থিতিকে একটি জাতীয় সংকট হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, কেবল কিস্তি সুবিধা বাড়িয়ে বা নতুন ঋণ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বৃদ্ধি এবং কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি। রাজনৈতিক দলগুলো ঋণের বোঝা কমাতে নতুন বিল আনার প্রস্তাব দিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে না আনলে এই অন্তহীন অভাব থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। বিশ্বজয়ী দেশটির মানুষ এখন ফুটবল মাঠের উল্লাসের চেয়ে দু’বেলা দু’মুঠো অন্নের নিশ্চয়তাকেই বড় জয় হিসেবে দেখছেন।