খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 16শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ২৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
২০২৫ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (কবিতা) ঘোষণা করা হলেও কবি মোহন রায়হানকে শেষ পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হয়নি। এই ঘটনায় দেশের সাহিত্য ও শিল্প অঙ্গনে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলা একাডেমি, যা একটি সংবিধিবদ্ধ স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, তার স্বায়ত্তশাসন এবং নীতিমালা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এবারের বিতর্ক নতুন নয়। ২০২৪ সালের পুরস্কার ঘোষণার সময়ও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। মুক্তিযুদ্ধ বিভাগে মোহাম্মদ হাননান এবং শিশুসাহিত্যে ফারুক নওয়াজের নাম ঘোষণা করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। কথাসাহিত্য বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত সেলিম মোরশেদ প্রতিবাদ স্বরূপ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
মোহন রায়হান বলেন, “এই পুরস্কার নেওয়ার আর প্রশ্নই আসে না। আমার সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা অমানবিক। আমি পুরস্কার চাইনি।” তিনি জানান, অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ থাকলেও তাকে পুরস্কার না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানা যায়, “মোহন রায়হানের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ রয়েছে, যা খতিয়ে দেখার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম জানিয়েছেন, “এ মুহূর্তে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সিদ্ধান্ত হলে তা জানানো হবে।”
পূর্ববর্তী বিতর্কের ইতিহাস
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬০ সালে। স্বাধীনতার পর থেকেই পুরস্কারকে ঘিরে বিতর্কের ইতিহাস রয়েছে। নিম্নলিখিত টেবিলে উল্লেখযোগ্য ঘটনা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বছর | বিভাগ | প্রাপক/প্রার্থীর নাম | বিতর্কের কারণ | মন্তব্য/পরিণতি |
|---|---|---|---|---|
| ১৯৭২ | প্রবন্ধ | বদরুদ্দীন উমর | নীতিগত কারণে গ্রহণে অস্বীকৃতি | পুরস্কার গ্রহণ করেননি |
| ১৯৮২ | নাটক | মামুনুর রশীদ | স্বৈরাচারী শাসকের হাতে গ্রহণ অস্বীকৃতি | পুরস্কার প্রত্যাখ্যান |
| ২০১৭ | অনুবাদ | নিয়াজ জামান | রাজনৈতিক কারণে অনুষ্ঠানে অনুপস্থিতি | পরে বাসভবনে পুরস্কার প্রদান |
| ২০২৪ | কথাসাহিত্য | জাকির তালুকদার | দলীয় প্রভাব ও বিবেচনা | পুরস্কার ফেরত প্রদান |
| ২০২5 | কবিতা | মোহন রায়হান | আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান স্থগিত | বিতর্ক চলমান |
পুরস্কারপ্রক্রিয়া
বাংলা একাডেমির নীতিমালা অনুযায়ী, নির্বাহী পরিষদ ৩০ জন ফেলো নিয়ে একটি প্রস্তাবক কমিটি গঠন করে। তারা ১৫ জানুয়ারির মধ্যে প্রার্থী প্রস্তাব করে মহাপরিচালকের কাছে পাঠান। মহাপরিচালক সাত সদস্যের পুরস্কার কমিটি গঠন করে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করেন। নির্বাহী কমিটি কোনো প্রার্থীকে ‘যৌক্তিক কারণে’ বিবেচনা না করার ক্ষমতা রাখে, তবে নতুন নাম যুক্ত করতে পারে না।
বিশিষ্ট লেখক ও শিক্ষাবিদরা মনে করেন, পুরস্কার প্রক্রিয়ায় সরকার বা মন্ত্রণালয় কোনো প্রভাব বিস্তার করলে এটি একাডেমির স্বায়ত্তশাসন ও মর্যাদার জন্য ক্ষতিকর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, “কবি ও শিল্পীদের স্বাধীনতা রক্ষা করা একাডেমির কর্তব্য। সরকারের উচিত এই স্বাধীনতা সম্মান করা।”
মোহন রায়হান ইতিমধ্যেই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ঘটনার বিস্তারিত জানাবেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন, বাংলা একাডেমি বিষয়টি স্পষ্টভাবে ঠিক করে ক্ষমা প্রার্থণ করবে।
এই ঘটনা পরের প্রজন্মের সাহিত্যিক ও শিল্পীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে কাজ করবে যে, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা বজায় রাখা কতটা অপরিহার্য।