খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাল সমুদ্রসীমায় নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। বাহরাইনের একটি বন্দরে নোঙর করা মার্কিন পতাকাবাহী তেলবাহী ট্যাংকার ‘স্টেনা ইম্পেরেটিভ’-এ অজ্ঞাতনামা বস্তুর আঘাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (২ মার্চ) ভোররাত আনুমানিক ৩টার দিকে এই হামলাটি পরিচালিত হয় বলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দুটি অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু অত্যন্ত নিখুঁতভাবে জাহাজটিকে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা হয়। বস্তুগুলোর আঘাতে জাহাজের একটি অংশে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তবে ক্রু সদস্যদের সাহসিকতা এবং স্থানীয় দমকল বাহিনীর প্রচেষ্টায় আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘ভ্যানগার্ড’ জানিয়েছে, সৌভাগ্যবশত জাহাজের কোনো নাবিক হতাহত হননি। নিরাপত্তার খাতিরে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব নাবিককে জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটি বাহরাইন বন্দরের একটি সুরক্ষিত জোনে অবস্থান করছে। মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দল এবং বাহরাইনের নিরাপত্তা বাহিনী যৌথভাবে হামলার ধরন এবং ব্যবহৃত বিস্ফোরকের উৎস সন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে।
গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্য রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ইরানও এর পাল্টা জবাব হিসেবে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো এবং ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুর ওপর ব্যাপক প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই সামরিক উত্তেজনার মাঝে ‘স্টেনা ইম্পেরেটিভ’ প্রথম কোনো মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজ, যা সরাসরি হামলার শিকার হলো। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী বা দেশ এই হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে আঙুল উঠছে আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধের দিকে।
নিচে জাহাজটির পরিচয় এবং বর্তমান পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেওয়া হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| জাহাজের নাম | স্টেনা ইম্পেরেটিভ (Stena Imperative) |
| পতাকা ও মালিকানা | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (মালিক: স্টেনা বাল্ক) |
| হামলার সময় | ২ মার্চ, ২০২৬ (ভোর ৩:০০ ঘটিকা) |
| আঘাতের ধরন | দুটি অজ্ঞাতনামা বিস্ফোরক বস্তু |
| ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ | আংশিক অগ্নিসংযোগ ও কাঠামোগত ক্ষতি |
| নাবিকদের অবস্থা | সবাই নিরাপদ ও স্থানান্তরিত |
শিপিং তথ্য সরবরাহকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা এলএসইজি (LSEG)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলা শুরুর সময় জাহাজটি সর্বশেষ তার অবস্থান সংকেত বা ‘ট্রান্সপন্ডার’ চালু রেখেছিল। এরপর থেকে রহস্যজনকভাবে জাহাজটির গতিবিধি সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামলার ঝুঁকি এড়াতেই হয়তো জাহাজটি তার স্বয়ংক্রিয় সনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রেখেছিল।
পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগর দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজে এই ধরনের হামলার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ায় বীমা কোম্পানিগুলোও তাদের প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দিতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
হামলার পর বাহরাইন ও সংলগ্ন সমুদ্রসীমায় মার্কিন পঞ্চম নৌবহর (US 5th Fleet) তাদের টহল জোরদার করেছে। কোনো পক্ষ দায় স্বীকার না করলেও এই ঘটনাটি যে ইরান ও পশ্চিমাদের মধ্যকার চলমান উত্তেজনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, তা স্পষ্ট।