খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 21শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ৫ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও স্থলের যুদ্ধের আঁচ এখন আছড়ে পড়ছে আরব উপসাগরের নীল জলরাশিতে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিধ্বংসী সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস’ (UKMTO) নিশ্চিত করেছে যে, গত ২৪ ঘণ্টায় আরব উপসাগর ও এর আশপাশে অন্তত পাঁচটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই সিরিজ হামলা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং নৌ-বাণিজ্যের ওপর নতুন করে ভীতি ও অস্থিরতা ছড়িয়ে দিয়েছে।
ইউকেএমটিও-র তথ্যমতে, হামলার ধরনে বৈচিত্র্য ও নিখুঁত লক্ষ্যভেদের প্রবণতা দেখা গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ উপকূলে অবস্থানরত দুটি বিশালাকার তেলবাহী ট্যাংকারে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত লেগেছে। এতে জাহাজ দুটির ফানেল ও বহিরাবরণ (স্টিল প্লেট) ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড থেকে জাহাজগুলো রক্ষা পেয়েছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাটি ঘটেছে হরমুজ প্রণালির প্রবেশপথে, যেখানে একটি কনটেইনারবাহী জাহাজকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এছাড়া ওমান উপকূল এবং দুবাইয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় জলসীমায় আরও দুটি জাহাজের অত্যন্ত কাছে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটেছে, যা মূলত সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
| ঘটনার স্থান | জাহাজের ধরন | হামলার প্রকৃতি | ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা |
| ফুজাইরাহ উপকূল | তেলবাহী ট্যাংকার (২টি) | ক্ষেপণাস্ত্র হামলা | ফানেল ও স্টিল প্লেট ক্ষতিগ্রস্ত। |
| হরমুজ প্রণালি | কনটেইনারবাহী জাহাজ | সরাসরি আক্রমণ | নৌ-চলাচল ব্যাহত। |
| ওমান উপকূল | বাণিজ্যিক জাহাজ | সন্নিকটে বিস্ফোরণ | মানসিকভাবে আতঙ্ক সৃষ্টি। |
| দুবাইয়ের পশ্চিম অংশ | বাণিজ্যিক জাহাজ | সমুদ্রগর্ভে বিস্ফোরণ | জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন। |
| সামগ্রিক প্রভাব | জ্বালানি ট্যাংকার | ৯০% চলাচল হ্রাস | বৈশ্বিক তেলের বাজারে অস্থিরতা। |
গত সোমবার ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে কৌশলগত ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই এই অস্থিরতা শুরু হয়। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তাদের আকাশসীমায় হামলার প্রতিবাদে তারা এই জলপথ দিয়ে কোনো শত্রুপক্ষীয় বা সন্দেহভাজন জাহাজ চলাচল করতে দেবে না। ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) এবং নৌবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো জাহাজ বিনা অনুমতিতে বা জোরপূর্বক প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে সেটিকে তাৎক্ষণিক লক্ষ্যবস্তু করতে।
জ্বালানি বাজার পর্যবেক্ষণকারী বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’ (Kpler) তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে তেলের ট্যাংকার চলাচল অবিশ্বাস্যভাবে ৯০ শতাংশ কমে গেছে। বিশ্বের মোট সমুদ্রজাত তেলের এক-তৃতীয়াংশ এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়, ফলে এই স্থবিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক মহাবিপর্যয়ের সংকেত দিচ্ছে।
আরব উপসাগরে এই সিরিজ হামলার ফলে আন্তর্জাতিক নৌ-বিমা কোম্পানিগুলো এই রুটে চলাচলকারী জাহাজের প্রিমিয়াম বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক শিপিং কোম্পানি তাদের জাহাজগুলোকে উত্তমাশা অন্তরীপ (Cape of Good Hope) দিয়ে ঘুরে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে, যা পণ্য পরিবহনের খরচ ও সময় দুটোই বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি অবিলম্বে ইরানের ওপর হামলা বন্ধ না করে, তবে ইরান এই ‘ট্যাঙ্কার ওয়ার’ বা জাহাজ যুদ্ধকে আরও গভীরে নিয়ে যাবে।
বর্তমানে আরব উপসাগরের পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, সামান্য কোনো ভুল বোঝাবুঝি থেকেও বড় ধরনের নৌ-সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে। একদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর টহল এবং অন্যদিকে ইরানের আত্মঘাতী ড্রোন ও ডুবো-ক্ষেপণাস্ত্রের উপস্থিতি এই অঞ্চলটিকে একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করেছে। সামনের দিনগুলোতে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্ব সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখাই হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।