খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 13শে চৈত্র ১৪৩২ | ২৭ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
এশিয়া-প্যাসিফিক (এপিএসি) অঞ্চলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমবর্ধমান সাইবার জালিয়াতির মুখে নতুন করে ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার যত দ্রুত হচ্ছে, ততই বাড়ছে প্রতারণামূলক কার্যক্রমের মাত্রা। বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত জালিয়াতি এবং কৃত্রিম পরিচয়ভিত্তিক প্রতারণা এখন ব্যবসার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি আন্তর্জাতিক সাইবারক্রাইম বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১৬ বিলিয়ন ডিজিটাল লেনদেন বিশ্লেষণ করে জালিয়াতির নতুন প্রবণতা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে “সিনথেটিক আইডেন্টিটি ফ্রড” বা কৃত্রিম পরিচয়ভিত্তিক জালিয়াতি আট গুণ বেড়েছে এবং বর্তমানে মোট ডিজিটাল জালিয়াতির প্রায় ১১ শতাংশ জুড়ে রয়েছে।
সিনথেটিক আইডেন্টিটি ফ্রড এমন এক ধরনের প্রতারণা, যেখানে অপরাধীরা বাস্তব ও ভুয়া তথ্য একত্র করে একটি নতুন পরিচয় তৈরি করে—যাকে অনেক সময় “ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন আইডি” বলা হয়। এই ধরনের পরিচয়ের কোনো বাস্তব ব্যক্তি না থাকায় প্রতারণা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতারকরা প্রথমে এই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে গ্রাহক যাচাইকরণ (KYC) প্রক্রিয়া পেরিয়ে যায়, এরপর বীমা পলিসি বা আর্থিক সেবা গ্রহণ করে দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বাসযোগ্য লেনদেনের ইতিহাস তৈরি করে। পরবর্তীতে তারা বড় অঙ্কের ভুয়া দাবি উত্থাপন করে আর্থিক সুবিধা আদায় করে।
লাতিন আমেরিকায় এই ধরনের জালিয়াতি ইতোমধ্যে মোট প্রতারণার প্রায় ৪৮.৩ শতাংশ দখল করে নিয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
প্রতিবেদনটি আরও জানায়, ২০২৫ সালে ক্ষতিকর বট বা স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারভিত্তিক আক্রমণ ৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব আধুনিক টুল এখন মানুষের আচরণ অনুকরণ করতে সক্ষম—যেমন মাউস কার্সরের নড়াচড়া বা টাইপিং প্যাটার্ন—ফলে প্রচলিত আচরণভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়া সহজ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে ডেস্কটপ ব্রাউজারভিত্তিক আক্রমণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা ইঙ্গিত করে যে প্রতারকরা আরও উন্নত ও জটিল প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
বিশ্বব্যাপী এখনো সবচেয়ে বড় জালিয়াতির উৎস হিসেবে রয়েছে “ফার্স্ট-পার্টি ফ্রড”—যেখানে প্রকৃত গ্রাহক নিজের তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলভাবে উপস্থাপন করে আর্থিক সুবিধা নেয়। এ ধরনের প্রতারণা মোট জালিয়াতির প্রায় ৩৮.৩ শতাংশ।
ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা (ইএমইএ) অঞ্চলে এই প্রবণতা আরও তীব্র, যেখানে অর্ধেকেরও বেশি জালিয়াতির জন্য দায়ী এই ধরনের প্রতারণা।
এপিএসি অঞ্চলে ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি জালিয়াতির হারও বেড়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলে আক্রমণের হার দাঁড়িয়েছে ১.৭ শতাংশে। যদিও এই হার আপাতদৃষ্টিতে কম মনে হতে পারে, তবে বিপুল পরিমাণ লেনদেনের কারণে এর আর্থিক প্রভাব অত্যন্ত বড়।
এই অঞ্চলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষভাবে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে বলা হয়েছে, কারণ প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
| সূচক | পরিমাণ/হার |
|---|---|
| মোট বিশ্লেষিত লেনদেন (২০২৫) | ১১৬ বিলিয়ন |
| সিনথেটিক আইডেন্টিটি ফ্রড বৃদ্ধি | ৮ গুণ |
| মোট জালিয়াতিতে এর অংশ | ১১% |
| স্বয়ংক্রিয় বট আক্রমণ বৃদ্ধি | ৫৯% |
| প্রথম পক্ষের জালিয়াতির হার | ৩৮.৩% |
| লাতিন আমেরিকায় সিনথেটিক ফ্রড | ৪৮.৩% |
| এপিএসি অঞ্চলে আক্রমণের হার | ১.৭% |
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতিতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত উন্নত সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ, শক্তিশালী পরিচয় যাচাইকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। পাশাপাশি কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধিও অত্যন্ত জরুরি।
ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে জালিয়াতির ধরনও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই। অন্যথায়, এশিয়া-প্যাসিফিকসহ বৈশ্বিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতে পারে।