খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 25শে চৈত্র ১৪৩২ | ৮ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার পেছনে পরিকল্পিত তৎপরতার আশঙ্কা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে, যার ফলে ডলারের বিনিময় হার অযৌক্তিকভাবে বাড়ছে এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে বাজারে নানা ধরনের গুজব ছড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—ডলারের দর দ্রুত বেড়ে ১৩০ টাকায় পৌঁছাতে পারে। এ ধরনের প্রচারণা ব্যাংক ও ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং স্বাভাবিক লেনদেনের পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি ডলার কেনার কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে বিরত রয়েছে এবং বাজার পর্যবেক্ষণ জোরদার করেছে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার উদ্বৃত্ত একটি নির্দিষ্ট সীমার বেশি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার ক্রয় করে থাকে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের হস্তক্ষেপ না করে বাজারের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ পরিস্থিতি ইতিবাচক। প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধির ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসা অর্থপ্রবাহ দেশের মোট প্রবাসী আয়ের সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে।
নিচে সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতির একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো—
| সূচক | পরিমাণ |
|---|---|
| মার্চ মাসে প্রবাসী আয় | ৩.৭৭ বিলিয়ন ডলার |
| ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাংকের মজুত | ২.৩০ বিলিয়ন ডলার |
| মার্চ মাসে ব্যাংকের মজুত | ৩.৯০ বিলিয়ন ডলার |
| আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলার দর | ১২২.৮৫ টাকা |
| প্রবাসী আয়ের ক্রয়দর | ১২৩.৫০ টাকা |
| খোলা বাজারে ডলার দর | ১২৫.৫০ টাকা |
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, ডলারের প্রকৃত চাহিদা তেমন না থাকলেও বিনিময় হার বেড়ে চলেছে, যা স্বাভাবিক বাজার আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার উদ্বৃত্ত এক বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা সরবরাহ বৃদ্ধিরই ইঙ্গিত দেয়।
তবে কিছু ব্যাংকে আগাম ডলার ক্রয়চুক্তির চাপ বাড়ছে, যা কৃত্রিমভাবে বাজারে চাহিদা সৃষ্টি করছে। এর ফলে ডলারের দর অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে কয়েকটি ব্যাংকের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে সরাসরি তদন্তে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, উচ্চ বিনিময় হারের কারণে তারা ডলার ক্রয়ে আগ্রহী নন, কারণ বাজারে বাস্তব চাহিদা নেই। অন্যদিকে, একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্যাংক ইচ্ছাকৃতভাবে ডলারের দর বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্ন, বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। পাশাপাশি জ্বালানির দাম সমন্বয়ের সম্ভাবনা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য বাজারে জল্পনা-কল্পনা বাড়িয়ে তুলছে, যা কিছু গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে।
সার্বিকভাবে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী থাকলেও কৃত্রিম চাপ ও গুজবের কারণে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় তদারকি এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।