খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
নরসিংদীর মাধবদীতে একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্লে-শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পবিত্র দ্বীনি শিক্ষার আড়ালে কোমলমতি শিশুর ওপর এমন অনৈতিক লালসা চরিতার্থ করার ঘটনায় স্থানীয় জনমনে গভীর ক্ষোভ ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন।
ঘটনাটি ঘটেছে নরসিংদী জেলার মাধবদী থানাধীন কোতালিরচর মাটির মসজিদ হাজী পাড়া এলাকায় অবস্থিত ‘মাদরাসায়ে দারুল আকরাম’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানে। ভুক্তভোগী শিশুটি উক্ত মাদ্রাসার প্লে-গ্রুপের একজন নিয়মিত শিক্ষার্থী, যার বয়স মাত্র সাড়ে পাঁচ বছর।
মামলার এজাহার ও নির্ভরযোগ্য পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ৯ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) দুপুরে মাদ্রাসার নিয়মিত পাঠদান চলাকালীন এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। ওই দিন শ্রেণিকক্ষে শিশুটিকে একা পেয়ে প্রধান শিক্ষক সুমন মিয়া তার ওপর লোলুপ দৃষ্টি দেন। শিক্ষার পবিত্র পরিবেশকে কলুষিত করে তিনি শিশুটির শরীরের বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে স্পর্শ করেন এবং তাকে চরমভাবে যৌন হয়রানি করেন। শিশুটি বাড়িতে ফিরে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তার পরিবারের কাছে শিক্ষকের এই কুরুচিপূর্ণ আচরণের কথা প্রকাশ করে।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর ১০ এপ্রিল (শুক্রবার) রাতে ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে মাধবদী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, অভিযুক্ত শিক্ষক সুমন মিয়ার (৩১) বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো প্রকার আপস করা হবে না এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে পেশ করা হবে।
গ্রেপ্তারকৃত শিক্ষকের বিস্তারিত পরিচয় ও ঘটনার মূল তথ্যসমূহ নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| অভিযুক্তের নাম | সুমন মিয়া (৩১)। |
| পিতার নাম | জসেদ মিয়া। |
| স্থায়ী ঠিকানা | গ্রাম: সুরাশ্রম, থানা: নান্দাইল, জেলা: ময়মনসিংহ। |
| প্রতিষ্ঠানের নাম | মাদরাসায়ে দারুল আকরাম। |
| কর্মস্থল | প্রধান শিক্ষক (হাজী পাড়া, কোতালিরচর, মাধবদী)। |
| ভুক্তভোগীর পরিচয় | প্লে-শ্রেণির শিক্ষার্থী (বয়স ৫.৫ বছর)। |
| মামলার ধারা | নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ধারা ১০। |
| বর্তমান অবস্থা | গ্রেপ্তারকৃত ও জেলহাজতে প্রেরণের প্রক্রিয়া সচল। |
নরসিংদীর মাধবদীর এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও স্থানীয় জনপদে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে শিশুদের দ্বীনি শিক্ষার জন্য পাঠানো অভিভাবকরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, একজন শিক্ষকের কাছ থেকে এ ধরণের আচরণ সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি অশনিসংকেত। এলাকাবাসী অবিলম্বে এই নামসর্বস্ব মাদ্রাসার অনুমোদন যাচাই এবং দোষী শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
বিভিন্ন মানবাধিকার ও শিশু অধিকার রক্ষা সংগঠনের প্রতিনিধিরা এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, শিশুদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং শিক্ষকদের চারিত্রিক সনদ যাচাইয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। মাধবদী থানা পুলিশ এলাকার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় সজাগ থাকার পরামর্শ দিয়েছে। ওসি মো. কামাল হোসেন বলেন, “শিক্ষার মতো একটি মহান পেশায় থেকে যারা শিশুদের ওপর পাশবিক মানসিকতা পোষণ করে, তাদের কোনো ছাড় নেই। ভুক্তভোগী পরিবারটিকে সব ধরণের আইনি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।”
বর্তমানে শিশুটিকে প্রয়োজনীয় মানসিক ট্রমা কাটানোর জন্য কাউন্সেলিং এবং চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদকেও এই দায়ভার নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে যেন এমন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা জারি করা হবে। অভিযুক্ত শিক্ষককে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং পরবর্তী শুনানির মাধ্যমে তার যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা হবে বলে সাধারণ মানুষ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।