খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 6শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ১৯ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
গত ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে চরম অস্থিরতা পরিলক্ষিত হয়েছে। এক দিনের ব্যবধানেই এই কৌশলগত জলপথটি উন্মুক্ত করার আশাবাদ থেকে পুনরায় উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান স্নায়ুযুদ্ধ এবং পাল্টাপাল্টি হুমকির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
গত শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বার্তায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেন। যদিও তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, ইরান এই পথে জাহাজ চলাচল এককভাবে সমন্বয় করবে। এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম তাৎক্ষণিকভাবে ১০ শতাংশ হ্রাস পায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
তবে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই পরিস্থিতি বদলে যায়। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত না হচ্ছে, ততক্ষণ ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ‘সম্পূর্ণরূপে’ বহাল থাকবে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) পুনরায় প্রণালিটি বন্ধ করার ঘোষণা দেয়।
আইআরজিসি-র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বজায় রেখে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সম্ভব নয়। ওমান উপকূল থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলিবর্ষণের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একটি ট্যাংকারের ক্যাপ্টেন দাবি করেছেন, ইরানি গানবোট থেকে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
নিচে এই সংকটের প্রধান প্রধান পক্ষ এবং তাদের বর্তমান অবস্থানের একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
| বিষয় | বিবরণ ও বর্তমান অবস্থা |
| মূল সংকট | হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ ও অবরোধ। |
| ইরানের দাবি | যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং জাহাজ চলাচলে ইরানি সমন্বয়। |
| যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান | শান্তিচুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বন্দর অবরোধ বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে সামরিক ব্যবস্থা। |
| আর্থিক প্রভাব | তেলের বাজারে অস্থিরতা (একদিনে ১০% দরপতন ও পরবর্তী অস্থিতিশীলতা)। |
| নিরাপত্তা ঝুঁকি | ওমান উপকূলে বাণিজ্যিক জাহাজে গুলিবর্ষণ এবং গানবোটের উপস্থিতি। |
| পরবর্তী সময়সীমা | ২১ এপ্রিল ২০২৬ (চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ)। |
ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদিও গত ছয় সপ্তাহে তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি, তবে তার পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে ইরানি নৌবাহিনীকে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানি সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল মোহাম্মদ নাকদি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়েছেন, যা ২০২৬ সালের মে মাসে উৎপাদিত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেননি। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে না এবং সমঝোতা না হলে পুনরায় বিমান হামলা শুরু হতে পারে। এই উত্তেজনার মধ্যেই ওয়াশিংটনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের হোয়াইট হাউসে জরুরি বৈঠক করতে দেখা গেছে।
হরমুজ প্রণালি ছাড়াও দুই দেশের মধ্যে আরও কিছু মৌলিক বিষয়ে গভীর মতভেদ রয়েছে:
ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর ও অপসারণ।
ইরানের চলমান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ করা।
স্থায়ী শান্তিচুক্তির শর্তাবলি নির্ধারণ।
আগামী ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। ইরানি সূত্রগুলো আগামী সপ্তাহে দ্বিতীয় দফার আলোচনার আশা করলেও, যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নিশ্চিত বার্তা দেয়নি। ফলে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—হরমুজ প্রণালি কি উন্মুক্ত হবে, নাকি এটি নতুন কোনো বড় সংঘাতের সূচনাবিন্দুতে পরিণত হবে।